সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / ফিচার সংবাদ / আধ্যাত্মিকতা চর্চার ঐতিহাসিক নিদর্শন-চারশো বছরের পুরনো সোনাতলার বিবি সাইবানির দরগা

আধ্যাত্মিকতা চর্চার ঐতিহাসিক নিদর্শন-চারশো বছরের পুরনো সোনাতলার বিবি সাইবানির দরগা

ইকবাল কবির লেমন: বগুড়া জেলার ইতিহাস সমৃদ্ধ উপজেলা সোনাতলা। উপজেলাটির গড়ফতেপুর, কাবিলপুর ও গড়চৈতন্যপুর গ্রামগুলোকে ঘিরে থাকা উঁচু মাটির গড় বেষ্টিত সামরিক দূর্গ ( অধুনা বিলুপ্ত), রাজা নীলাম্বর রায়ের বাড়ি (বিলুপ্ত), পাথর সাহেবের দরগার মতো স্থাপত্য নিদর্শন এলাকাটিকে ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে স্থান দিয়েছে। ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে স্থান করে দেয়া তেমনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন উপজেলার জোড়গাছা ইউনিয়নের নওদাবগা গ্রামে আধ্যাত্মিকতা চর্চার ঐতিহাসিক নিদর্শন- চারশো বছরের পুরনো ‘বিবি সাইবানির দরগা’। সোনাতলা উপজেলা সদর থেকে সোনাতলা-গাবতলী ভায়া বগুড়া সড়ক ধরে এগুতেই চোখে পড়বে বিরল প্রজাতির পারুল গাছ শোভিত সরকারি নাজির আখতার কলেজ। সরকারি নাজির আখতার কলেজ পিছনে ফেলে গাবতলী সড়ক ধরে একটু এগুলেই কাবিলপুরের ‘পাথর সাহেবের দরগা’। সে পথেই সর্পিল গতিতে এঁকেবেঁকে সাত কিলোমিটার যাওয়ার পর দেখা যাবে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ড.এনামুল হকের নামে প্রতিষ্ঠিত ড.এনামুল হক কলেজ। আরও কিলো দুয়েক এগুলেই অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের সোনাকানিয়া মোড়। সেখান থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে বয়ড়া টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও বয়ড়া কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে দু’টি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বয়ড়া থেকে তিন কিলোমিটার পথ ধরে এগুলেই নওদাবগা গ্রাম। সোনাতলা-গাবতলি পাকা সড়কের সংলগ্ন নওদাবগা জামে মসজিদের বাম পাশ দিয়ে একটি সেতু পেরিয়ে উত্তর দিকে যেতেই সবুজের সমারোহ। প্রায় পাঁচ/ছয় একর জমি জুড়ে বৃক্ষরাজিতে ভরা অরণ্যে পাখপাখালিদের অবাধ বিচরণ। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে মনে হবে যেন তারা স্বাগতই জানাচ্ছে অভ্যাগতদের। কিছুদুর এগিয়ে একটি গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই নজরে আসবে একটি সুদৃশ্য মসজিদ, সাবেক আমলের জমিদারী বাড়ি, পুরনো কবর ও মোঘল আমলে তৈরি দরগা।
মোঘল রীতিতে তৈরি এ দরগাটিকে দীর্ঘদিন ‘পুরাতন ইবাদতখানা’ বলা হলেও এতদিন অগোচরে ছিল বিবি সাইবানির কথা, যে আধ্যাত্মিক মহিলার কারণে মূলত এ দরগাটি তৈরি করা হয়। দরগা সংলগ্ন স্থানেই সুনামধন্য,সর্বজনপরিচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপা ও তাঁর সহধর্মিনী সোনাতলা উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া আমানের বাড়ি। মূলত তাদের পরিবারকে ঘিরেই দরগাটির ইতিহাস। জানা যায়, সাবেক চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপা এর পূর্ব পুরুষ আনার আকন্দ এসে সোনাতলার নওদাবগায় বসতি স্থাপন করেন। আনার আকন্দের পুত্রবধূ বিবি সাইবানি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মহিলা। তিনি বেশিরভাগ সময় ইবাদত-বন্দেগী ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর আধ্যাত্মিকতা চর্চা বিশেষত মোরাকাবা ও মোসাহাদা করার জন্য ছোট্ট পরিসরের দুইকক্ষ বিশিষ্ট এ দর্গাটি তৈরি করা হয়। মাটি থেকে প্রায় দুই ফুট উঁচু ইটের কমপ্লেক্সের উপর ইবাদত করার স্থানটিতে মোঘল আমলের স্থাপত্য রীতি বিদ্যমান। এর একটির দৈর্ঘ্য ১৪ ফুট ও প্রস্থ ৮ ফুট এবং অপরটির দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ও প্রস্থ ১০ ফুট। স্থাপনাটি দেখতে অনেকটা শিয়া ধর্মাবলম্বীদের ইমামবাড়ার মতো। ছোট ছোট ইট দিয়ে প্লাস্টারবিহীন অবস্থায় ঘর দুটো তৈরি। ঘর দুটোর উপরে রয়েছে ছোট আকারের একটি করে গম্বুজ। একটি ঘরে দু’টি ও অপর ঘরে রয়েছে একটি দরজা। ঘর দুটোর গায়ে রয়েছে বিশেষ নকশা। দরগাটি তৈরির সময় এর পাশে তৈরি করা হয় একটি মসজিদ যা বর্তমানে আধুনিক অবয়ব পেয়েছে।
এ ব্যাপারে কথা হয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপা এর দ্বিতীয় ছেলে শাহ কালিমুল্লাহ্ রাজ এর সাথে। তিনি জানান, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ আনার আকন্দের পুত্রবধূ ‘বিবি সাইবানির নামে’ ১৬০০ খ্রিস্টাব্দের দ্বিতীয় দশকে মোঘল রীতিতে দরগাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিবি সাইবানির স্বামী দেওয়ান আকন্দ (আনার আকন্দের পুত্র)। আনার আকন্দ ও তাঁর পুত্র দেওয়ান আকন্দও ছিলেন আধ্যাত্মিক কামেল ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। আধ্যাত্মিকতা চর্চার জন্যই দরগাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিবি সাইবানির উত্তরসূরী হিসেবে আমরা এ দরগাটির দেখভাল করছি ও আধ্যাত্মিকতা চর্চা অব্যাহত রেখেছি।’
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহ্ আমান উল্লাহ টেপা’র স্ত্রী ও উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া আমান জানিয়েছেন, ‘২০১২ সালে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি এই পুরাকীর্তিটিকে সংস্কারের উদ্দেশ্যে প্রশাসনকে জানালে প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের ডিডি ও কাস্টডিয়ান এসেছিলেন দেখার জন্য। পরে প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের লোকজন এসে এটি আংশিক সংস্কার করে। সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারি টিআর এর পাশাপাশি আমি ব্যক্তিগতভাবে অর্থ ব্যয় করেছি। এটি রক্ষায় এখনো বাকি রয়েছে অনেক কাজ। সময়মতো সেটি করা না গেলে বিলীন হয়ে যাবে ঐতিহাসিক এ নিদর্শন।’
মোঘল আমলে তৈরি বিবি সাইবানির এ দর্গাটিতে আসলে যে কেউ পুলকিত হবে, আনন্দে উদ্বেলিত হবে সৌন্দর্যপিপাসু মন,পাশাপাশি জানতে পারবে ইতিহাসের অজানা তথ্য।

Check Also

রঙিন মাছ চাষে ভাগ্য বদল মহিমাগঞ্জের বিপ্লবের

মনজুর হাবীব মনজু, (গোবিন্দগঞ্জ) গাইবান্ধা থেকে : এসএসসি পাশের পর বাবার সাথে অভিমানে বাড়ি ছেড়েছিলেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × one =