সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / আমার ভালবাসার বাংলাদেশ—জামিল আখতার বীনু

আমার ভালবাসার বাংলাদেশ—জামিল আখতার বীনু

‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’
আমাদের বাংলাদেশ। এদেশের জন্য রয়েছে আমাদের প্রাণভরা ভালবাসা। বলতে চাই ভালবাসি-ভালবাসি বাংলা আমরা তোমাকে ভালবাসি। ভালবাসি বাংলার মাটি, ভালবাসিবাংলার জল, ভালবাসি বাংলার বায়ু, ভালবাসি বাংলার আলো।
আর সেই সঙ্গে আরও ভালবাসি আমাদের দেশের দুঃখ-অভাব-দুর্দশাগ্রস্ত জীবন। প্রাণপণে চাই এসব দূর করতে। পারি না, তাই বুঝি এ আমার অক্ষম উচ্চারণ। আমার শিশুকালের একটা কথা খুব মনে পড়ে। বাবা আমাকে ঘুম পাড়াতেন গান গেয়ে- ‘তারা ফুলের ওপর ঘুমিয়ে আছে ফুলের মধু খেয়ে’-। বাবা আজ নেই। কিন্তু আজও বাবার সুরেলা কন্ঠ আমার কানে বাজে। ভাবি, সত্যি কি তারা ঘুমিয়ে আছে ফুলের মধু খেয়ে। যদি তাই হবে-তবে দেশে এত কষ্ট, এত দুঃখ কেন? এক চমকে আবার ভাবি,আজও তো আমাদের দেশে ফুল ফোটে, চাঁদ ওঠে, পাখি গান গায়। কাঠফাটা প্রান্তর দেখতে দেখতে আজও মনে পড়ে আমার হারানো অতীত। যে অতীত উদার আকাশের মতো হাজারো স্মরণ তারার আলোয় উজ্জ্বল। জানি অতীত মৃত, বর্তমান তাৎক্ষণিক আর
ভবিষ্যৎ-তা সুন্দরের স্বপ্নে মগ্ন। যে মগ্নতায় সৃষ্টি হয় সুর। আর সেই সুর আমাকে ফিসফিসিয়ে কানে কানে বলে-“ও আমার
দেশের মাটি তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা।” দেশের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে আজ আমার অনেক প্রশড়ব। যুগান্তরের চিঠি-লিখতে হবে
বাংলাদেশ নিয়ে। আমি তাই আমার ভালবাসার জন্য লিখছি। এই ভালবাসা আমাকে নিয়ে গেল অনেক সোনালী দিনে, উজ্জ্বল
মণিমুক্তার ঝলকানিতে। জন্ম আমার ইংরেজ শাসনের পরাধীন দেশে, অর্থাৎ পরাধীন ভারতবর্ষে। শৈশবে বুঝিনি স্বাধীনতা আর পরাধীনতার পার্থক্য। শিশুরা কেউ তা বোঝেনা। তাপর ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ ভাগ হল। দেখেছি ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার ঘটনা।
সবটা মনে না থাকলেও কিছু কিছু মনে আছে। মনে আছে বাবা-চাচা-ফুফুরা মিলে রাত জেগে সবুজ কাপড় কেটে পাকিস্তানের পতাকা সেলাই করার ঘটনা। দেখেছি তাদের চোখেমুখে আনন্দ যেন উপচে পড়ে হাসছিল। তারপর দিন গড়িয়ে, মাস গড়িয়ে বছর গড়িয়ে অনেক সময় চলে গেছে। আমি ছেড়ে এসেছি আমার আনন্দের শৈশব, উচ্ছ্বাসের কৈশোর, মৌ মৌ করা
যৌবন। মাতাল হয়ে ঘুরেছি দেশের আনাচে-কানাচে। ভালবেসেছি বাংলার প্রকৃতি। মুগ্ধ চোখে ভালবেসেছি বাংলার অপরূপ রূপ। দিন যেতে যেতে কখন যেন উপলব্ধি করেছি কোথায় যেন আমরা পুরোপুরি স্বাধীন নই।তারপর ১৯৭১ সালের অতুলনীয় মুক্তিযুদ্ধে আমরা স্বাধীন হয়েছি। পেয়েছি আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বুকভরা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমরা অপেক্ষা করেছি স্বাধীনতার। মুক্তিযুদ্ধের আবেগ-ভালবাসা উত্তাল সাগরের মতো মাতাল করেছিল বাঙালির মনকে।
সেদিন আমাদের সবার মনে ছিল দেশের জন্য বুকভরা ভালবাসা। বিকাশে যা সুন্দর হয়ে যা সুন্দর হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। তাইতো বাংলাদেশের জন্মের কথা ভাবতে গিয়ে আমার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ মিলেমিশে একাকার হয়ে
যায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ সীমা দেখেছি, দেখেছি থেমে যাওয়া যুদ্ধ। দেখেছি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দেখেছি ধর্মের নামে নিষ্ঠুরতা। ভুলে যেতে চেয়েছি সেসব স্মৃতি। ভুলিনি, কারণ আজও মাঝে মাঝে আমাদের চারিদিকের বাতাস সেই নিষ্ঠুরতার গন্ধ
বয়ে আনে। আমি যতই চাই চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদা মঙ্গল মিলেমিশে একাকার হয়ে যাক উত্তর-পুরুষের চেতনায়। কিন্তু প্রাপ্তি? তা অপ্রাপ্তির খাঁচায় বন্দি থাকে। ১৯৭১ থেকে ২০২০। দীর্ঘ ৪৮ বছর পারহয়ে এসে আমরা হিসাব করি স্বাধীনতার জন্মপঞ্জি। কত মূর্খ জাতি আমরা! সজিব প্রাণবন্ত সুন্দর একটা গাছকে টুকরো করে কেটে আমরা দেখতে চাই-গাছটা কে লাগিয়েছিল? বীজটা কে এনেছিল? চারাটা কোথায় প্রম জন্মেছিল? যতড়ব করে গাছটা বাঁচিয়ে না রেখে আমরা বিশ্লেষণ করি। জীবন্ত সুন্দর দেহটা
অ্যানাটমির ক্লাসের মতো কেটে কেটে পরীক্ষা করি। আমরা ভুলে যাই পৃথিবীর নিসর্গ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। আজও প্রবলভাবে আলোড়িত করে এ দেশের কবিচিত্তকে। আত্মবিস্মৃত উন্মাদনায় মানুষ খোঁজে জীবনের গান-বাঁচার স্বপড়ব।
স্বপ্নের অপেক্ষায় তো জীবনের সৃষ্টি। ১৯৭১ সালে বাংলার অগণিত জনতা জীবনবাজি রেখেছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। দামাল ছেলেরা রক্তের খেলায় মেতেছিল শুধু দেশ স্বাধীন করার জন্য। বুকে ছিল আশা আর চোখে ছিল বিশ্বাস। আজকের বাংলাদেশ দেখে নিজেকে প্রশ্নে প্রশ্নে ক্ষত-বিক্ষত করি। একাত্তরের ভালবাসা কি সত্যি ছিল? তবে আজ দেশের এ অবস্থা কেন? যে দেশকে ভালবেসে একদিন প্রাণ উৎসর্গ করেছিল হাজার হাজার মানুষ, আজ তারাই কেন এতটুকু স্বার্থ ত্যাগ করে না দেশের জন্য। জানি না এ দোষকার বা কাদের? সন্ত্রাস আর বিশৃঙ্খলায় ভরা দেশটার দিকে চেয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে- এই কি আমাদের সোনার বাংলা। পথ চলতে থমকে যাই-ভাবি এ বুঝি মুখ থুবড়ে পড়ব। কেন এমন হবে? এই স্বাধীনতাই কি আমাদের চাওয়া ছিল? না কি চাওয়ায় কোনও ভুল ছিল। ভালবাসা ভুল করে না। দেশকে ভালবাসা তো ভুল করতেই পারে না। দেশপ্রেম তাই ঝর্ণার কুলকুল ধ্বনি হয়ে পরীর পাখায় ভর দিয়ে আসতে পারে। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আবেগতপ্ত উদ্দাম ছন্দের গর্জন পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছিল। আমরা পেয়েছিলাম প্রজাপতির রঙিন পাখার স্বাধীনতা। বিজন ভূঁয়ে শুয়ে সারা নিশি তারার বাঁশি শুনেছিলাম। মেঠো ফুলের গন্ধ নিয়েছিলাম বুক ভরে। নিশি শেষে সকালবেলা খুঁজে দেখি, স্বপেড়ব শোনা সুর হারিয়ে গেছে।
মেঠোফুলের চোখের জল আজ ধর্ষিতা নারীর অশ্রু হয়ে ঝরে। ঘাসের কোলে আলোর ভাষা খুঁজতে গিয়ে মেয়েহারা মা মুখ
লুকায় ছেঁড়া শাড়ির আঁচলে। ভরা ক্ষেতে লুটিয়ে পড়া কাঁদন নবীন ধানের শীষে বাজে। পিতা খোঁজে তার সবল যুবক
পুত্রকে। মুক্তিযোদ্ধার সবল হাত আজ পঙ্গু। সেই পঙ্গু হাত যখন ভিক্ষা চায়- তখন কি আমাদের মনে শত-সহস্র কান্নার
বাঁশি বাজে না? মনে হয় না কি-আবার আমরা যুদ্ধ করি। আরএ যুদ্ধ স্বাধীনতার যুদ্ধ নয়-ভাত-কাপড়ের যুদ্ধ, অন্যায়ের
বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধ। আধুনিক সভ্যতার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমরা বড়াই করি সভ্যতার। কিন্তু প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললে
দেখি টুকরা করা লাশের খবর। দেখি ধর্ষিতা মেয়ের আত্মহননের খবর। তবুও আমরা সভ্য জাতি। স্বাধীন দেশে বাস করে
আমরা দেখতে চাই প্রকৃতির সোনার হাসি,খুঁজতে চাই মানুষের উদার হৃদয়, পেতে চাই সৃষ্টির আনন্দ। বহমানতাই
জীবন। থামা মানে মৃত্যু। স্বাধীন বাংলাদেশ আমার-আপনার সবার। তাইতো সবার প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত এ দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। অন্যায় আর অমঙ্গল দূর করা। আসুন আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি, আমরা ভাল থাকব, অন্যায় করব না,
অন্যায়কে হতে দেব না কারও হাতিয়ার। তাহলে অচিরেই দেশটা সুন্দর হবে। ভালো-মন্দ মেশানো এ পৃথিবী। তাই পরিপূর্ণ ভালো হয়তো হবে না-হতে পারে না। তবুও তো মঙ্গল আলোকে মাথা উঁচু করে বলতে পারব আমরা তুচ্ছ নই। আমাদের ঐতিহ্য
আছে, সভ্যতা আছে, আমরা বাঙালি। কাঙালের মতো এ প্রার্থনা আমার কত দিনের। জীবন তার দাবী কখনোই পরিত্যাগ করবে না। জীবন অর্থ পঞ্চইন্দ্রিয়, আদিম উন্মাদনা, অনতিক্রম্য শাসন । বাংলার সৌন্দর্য অপরূপ রূপের সমাহার। আমি
আজও খুঁজি চাঁদচম্পা নদীকূলে বটের ফলের মৌ মৌ করা সোনালী গন্ধ। সে আমার মা-বাংলার
মা-জন্মভূমি আমার। ভালবাসার প্রান্ত ছুঁয়ে বুকের গভীরে ডুবে আছে আমার বাংলাদেশ। কয়েকদিন আগে ঢাকা ছেড়েছিলাম। শীতের সুবাতাস আর ফসল কাটা রুক্ষ প্রান্তর দেখে বাংলাকে আরও ভালবাসলাম। শর্ষে ফুলের হলুদের উজ্জ্বলতায় শিশিরের মাখামাখি আমাকে আবেগে ভরে দিল। মুগ্ধ চেতনা বহন করল সৃষ্টির বাণী। আকাশের বিজে
ভিজে রোদ “কদম্বের বন হতে কিবা শব্দ আচম্বিতে আসিয়া পশিল মোর কানে-” আমরা বাঙালি। বাংলাদেশ আমাদের দেশ।
জীবনের বহতাঘোড়া ছুটিয়ে আমরা দেখতে পাই সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা। ইতিহাস প্রবাহমান। আশা আর প্রত্যাশা তাই মঙ্গলের। দু’হাত তুলে তাই বলতে চাই কবিগুরুর ভাষায়- ‘নব আনন্দে জাগো।’

জামিল আখতার বীনু- লেখক-সম্পাদক,
সরকারি নাজির আখতার কলেজ এর
প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য।
………………………………

Check Also

ড. আজাদুর রহমান এর কবিতা ‘শোক’

মরণের পাশে বসে আছি মানুষের পাপ এবং প্রার্থনার মত, নিজের মুদ্রাদোষে অবিরত একা এবং একমাত্র …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 + thirteen =