সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / ফিচার সংবাদ / একটি খুঁড়ুলে পেঁচা তার পুরো জীবনে ৩৬ কোটি ৫ লক্ষ টাকার ফসল রক্ষা করে

একটি খুঁড়ুলে পেঁচা তার পুরো জীবনে ৩৬ কোটি ৫ লক্ষ টাকার ফসল রক্ষা করে

ইমরান এইচ মন্ডলঃ  একটি খুঁড়ুলে পেঁচা তার পুরো জীবনে ৩৬ কোটি ৫ লক্ষ টাকার ফসল রক্ষা করে। অনেকে এটিকে খুঁড়ুলে পেঁচা, খোঁড়লে পেঁচা, কোটরে পেঁচা নামে অবিহিত করে থাকে। তবে এর বৈজ্ঞানিক নাম : Athene brama. ইংরেজি: Spotted Owlet,  বা স্ট্রিগিডি (Strigidae) গোত্র বা পরিবারের অন্তর্গত ক্ষুদ্রকায় এক প্রজাতির পেঁচা। খুঁড়ুলে পেঁচার আবাস মূলত এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে।  বাংলাদেশভুটানভারতপাকিস্তাননেপালমিয়ানমারকম্বোডিয়াভিয়েতনামথাইল্যান্ড ও লাওস। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলেও এদের দেখা যায়। এ প্রজাতিটি শ্রীলঙ্কায় নেই, তবে পক প্রণালীর আশেপাশে শ্রীলঙ্কার উপকূলে এদের দেখা যায়।

বৈশিষ্ট্য বাসস্থান এবং আচরণ:

বেশ নাদুস-নুদুস দেখতে এই ছোট পেঁচার চোখের চারিদিক ও গলা সাদা। চোখের তারা ফ্যাকাশে থেকে সোনালি হলুদ। শরীরের তুলনায় মুখ ছোট। পিঠের দিক গাঢ় বাদামী, তার উপর সাদা ফোঁটা থাকে। মাথার উপরের ফোঁটাগুলো ছোট আকারের। সাদাটে পেটের দিকে আনুভূমিক বাদামী রেখা দেখা যায়। বাদামী লেজে চিকন সাদা বলয়। ঠোঁট সবুজ, পা ও পায়ের পাতা অনুজ্জ্বল হলদে-সবুজ। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে অভিন্ন। দৈর্ঘ্যে কমবেশি ২৩ সেন্টিমিটার।

জোড়ায় জোড়ায় থাকে এবং এক জোড়া একই জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। মাঝেমাঝে পারিবারিক দলেও থাকে। সন্ধ্যায় এবং খুব ভোরে এরা বেশি কর্মচঞ্চল  খুঁড়ুলে পেঁচা নিশাচর। রাতভর শিকার করে। প্রত্যেকটি জোড়ার নির্দিষ্ট  সীমানার পরিচিত গাছের ফোকর, বড় ডালের গোড়ার আবডাল, অব্যবহৃত বাড়িঘর, দালান-কোঠার ফাঁক-ফোকরে দিন কাটায়।সাধারণত গাছের কোটরে বা খোঁড়লে এরা বাসা করে বলেই এদের এমন নাম, তবে দালান-কোঠার ফাঁক-ফোকরেও বাসা করতে দেখা যায়। মানব বসতি বা কৃষিভূমির আশেপাশে এদের সাধারণ আবাস, শহরেও এরা নিজেদের রপ্ত করে নিয়েছে। দিনে দু’-একবার রোদ পোহায় ও শত্রু পর্যবেক্ষণ করে। বাদলা দিনের সকালে বা বিকালে খাবার ধরার জন্য বের হতে পারে। এরা দিনের প্রহরে দু’-একবার ডাকলেও রাতের প্রায় সব প্রহরেই ডাকে এবং অনেকসময় অন্য পাখিদের সাথেও যোগ দিয়ে ডাকতে পারে। দিনের বেলায় এ পেঁচার দর্শন পেলে ওদের দিকে তাকিয়ে মাথা উঁচু-নিচু করলে ওরাও সুন্দর ভঙ্গিতে ওদের মাথা উঁচু-নিচু করে।

এদের প্রজনন মৌসুম নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। প্রজনন মৌসুমে ছোট মাথা এবং চকচকে লেজ দেখে স্ত্রী পেঁচাকে চেনা যায়। এদের বাসা বাঁধার উপাদানগুলোর মধ্যে থাকে শুকনো পাতা, পালক ও খড়কুটো। একসঙ্গে তিন থেকে চারটি ডিম দেয় কোটরে পেঁচা। গোলাকার ডিমগুলো হয় সাদা রঙের। ২৫ দিনে ডিম ফোটে। ৩০ দিনে ছানাদের গায়ে পালক গজায়।

খাদ্যভ্যাস :

খুঁড়ুলে পেঁচা মাংসাশী শিকারী পাখি। ইঁদুর আর ছুঁচো এদের প্রধান শিকার। এছাড়া খাদ্য তালিকায় আছে উড়ন্ত পোকা, টিকটিকি, বাদুড়, ছোট পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী। এরা মূলত ঠোঁট দিয়ে শিকার করে, ঠোঁট দিয়ে শিকারের ঘাড় ভেঙে দেয়। নখ মৃত শিকার ধরার কাজে ব্যবহার করে। পুরো শিকার একবারে গিলে খায়। শিকারের হজম না হওয়া অংশ, যেমন হাড় ও লোম এরা দলা আকারে উগরে দেয়, ইংরেজিতে একে পেলেট বলে।

প্রধান হুমকি:

এরা বিশেষক্ষেত্রে রাতে ইঁদুরের খোঁজে ফল বাগনের আশেপাশে বিচরণ করে। আমরা প্রায়ই দেখি ফল বাগানের মালিকগণ তাদের ফল বাগানকে রক্ষা করার জন্য বাগানের চারদিকে অবৈধ কারেন্ট জাল দিয়ে ঢেঁকে দেয়। যখন এরা ইঁদুর ধরতে যায় তখন এরা ঐসব জালে আটকা পড়ে নির্মমভাবে মারা পড়ছে।

আবার অনেকক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের লোকজন পেঁচার ডাক শুনলে মৃত্যু হয় বা এরা অশুভ আত্মার বাহক এমন কুসংস্কার এর ফলে এদের হত্যা করে। এছাড়াও ভারতীয় উপমহাদেশে একসময় বিশ্বাস করা হতো, পেঁচার ঔষধি গুণ আছে। আর তাই পেঁচার হাড়-মাংস-রক্ত দিয়ে তৈরি করা হতো রাতকানাসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ।

বিগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা কমে গেলেও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যেয়ে পৌঁছায় নি। সেকারণে আই. ইউ. সি. এন. খুঁড়ুলে পেঁচাকে Least Concern বা আশঙ্কাহীন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

উপকারীতা :

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে পেঁচা অনেক উপকারী ভূমিকা পালন করে। এসব অঞ্চলের পেঁচাদের প্রধান শিকার ইঁদুর। আর এই ইঁদুর হচ্ছে ফসলের শত্রু। ইসরায়েল, জর্ডান ও প্যালেস্টাইন অঞ্চলে কৃষিজমির আশপাশ দিয়ে পেঁচার জন্য বাসা বানিয়ে রাখা হয়। এক জোড়া পেঁচা বছরে গড়ে ছয় হাজার ইঁদুর শিকার করে।

এছাড়াও এরা ফসলের ক্ষতিকারক পোকামাকড়ও খেয়ে ফসল ও কৃষকের উপকার করে থাকে।

Check Also

একটি কোলা ব্যাঙ তার পুরো জীবনে ৭৬ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকার ফসল বাঁচায়

“কোলা ব্যাঙ/সোনা ব্যাঙ/হোলা ব্যাঙ/ভাউয়া ব্যাঙ”- বৈজ্ঞানিক নাম: Hoplobatrachus tigerinus, ইংরেজি: Bull frog বা Indian bull …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + eleven =