সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / বগুড়ার খবর / এক পরিবারের কাছে আটকে আছে ব্যাংকের প্রায় দুই শ’ কোটি টাকা

এক পরিবারের কাছে আটকে আছে ব্যাংকের প্রায় দুই শ’ কোটি টাকা

মো. আব্দুল ওয়াদুদ, বগুড়া প্রতিনিধি : বগুড়ায় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে দুই শ’ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি জহুরুল হক মোমিন, মোমিনের স্ত্রী শিরিন আখতার ঝুনু, তার আপন ভাই এনামুল হক বাবু এবং বাবুর স্ত্রী আইরিন হক রুমা। ইতোমধ্যেই মোমিন ব্যাংকের মামলায় জেলও খেটেছেন। অপর দিকে ২০১২ সাল থেকে গ্রেফতারি পরওয়ানা নিয়ে প্রকাশ্যে ছিলেন মোমিনের স্ত্রী শিরিন। ২০১৮ সালের ১১ জুন মধ্যরাতে তিনিও বগুড়ার জলেশ্বরীতলা এলাকা থেকে গ্রেফতার হন। তবে গ্রেপ্তারের মাত্র ছয় ঘন্টা পরেই তিনি জামিনে ছাড়া পান। বিশেষ ক্ষমতা বলেই ওই দম্পত্তি আইনের অলিগলি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। পারছে না ব্যাংকগুলো ধরতে হচ্ছে না মামলা করেও কোন সমাধান। শুধু জহুরুল হক মোমিনের নামে অর্থঋণ আদালতে ৮টি মামলা রয়েছে। আট মামলায় দেড় শ’ কোটি টাকার বেশি তার কাছে পাবে কয়েকটি ব্যাংক। তার আপন ভাই, স্ত্রী এবং ভাই এর স্ত্রী মিলে ধারণা করা হচ্ছে দুই শ’ কোটি টাকার কাছাকাছি তাদের ব্যাংক ঋণ। মোমিনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে অর্থঋণ আদালতে ৮টি মামলায় ২০১০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে রায়ও দেয়া হয়। সেখানে তাকে পৃথকভাবে প্রতিটি মামলায় ১ বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং জরিমানা যথাক্রময়ে ২৩৬/২০০৯ নং মামলায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, ৮৮/২০০৯ নং মামলায় ২১ কোটি ৯৪ লাখ, ৮৯/২০০৯ নং মামলায় ৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ৪১৫/২০০৯ নং মামলায় ১০ কোটি টাকা, ৫১৮/২০০৯ নং মামলায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ১২১/২০০৯ নং মামলায় ৫১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, ১২২/২০০৯ নং মামলায় ৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ৪১৬/২০০৯ নং মামলায় ৩ কোটি টাকা সাজাপ্রাপ্ত হয়। সব মিলিয়ে বগুড়া শহরের বিভিন্ন ব্যাংক জহুরুল হক মোমিনের কাছে পাবে দেড়শ’ কোটি টাকারও বেশি। মোমিন ব্যাংকের এসব মামলায় ২০১৩ সালের ৪ জুলাই জেলে যায়। সাড়ে চার বছর কারাবাসের পর হাইকোর্টে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়ে মুচলেকা দিয়ে দিয়ে জামিনে ছাড়া পান। জামিনের সময় আদালতকে অঙ্গিকার দিয়েছিলেন ব্যাংকের ঋণের টাকা তিনি ওই বছরের মধ্যেই পরিশোধ করবেন। কিন্তু এখনও ব্যাংকে টাকা ফেরত দেননি। এছাড়াও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড বগুড়া শাখা থেকে রিমা ফ্লাওয়ার মিলের নামে জহুরুল হক মোমিন ১২ কোটি ৯৮ লাখ ৫৭ হাজার, এনামুল হক বাবুর স্ত্রী আইরিন হক রুমার কাছে ব্যাংকের বর্তমান পাওনা ৩ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এছাড়াও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে একটি চক্র ৪১ কোটি টাকা উত্তোলন করে। সেই মামলাটি এখন দুদক পরিচালনা করছে। ওই মামলায় জহুরুল হক মোমিন ৯ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার এবং তার আপন ভাই এনামুল হক বাবু ৬ কোটি ৭৫ লাখ ৫ হাজার আত্মসাৎ করেছে। ওই মামলায় দুই ভাই বর্তমানে ওয়ারেন্টেড আসামী। ইসলামী ব্যাংকের দায়ের করা মামলা সূত্রে জানাযায়, শিরিন আখতার ঝুনু তার ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান শিরিন ট্রেডিং এ্যান্ড কোমম্পানির নামে ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা থেকে বিভিন্ন সময় লোন নিয়ে পরিশোধ করেন নি। ব্যাংক বিভিন্ন ভাবে তার সাথে কথা বলেও টাকা আদায় করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালের ২ আগস্ট বগুড়া জেলা অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা করেন ব্যাংক। তৎকালী ব্যাংকের বগুড়া শাখার সিনিয়র অফিসার রেজাউল করিম মামলাটির বাদী হন। ওই মালায় আদালাত ২০১২ সালের ১৬ জুলাই ৪কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৬ টাকা পরিশোধের আদেশ দেয় এবং তাকে গ্রেফতারের আদেশ দেয়।
অপরদিকে শিরিনের স্বামাী জহুরুল হক মোমিন ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা, প্রাইম ব্যাংক, এসআইবিএল ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে দেড় শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। এর মধ্যে কিছু ব্যাংক তাদের বন্ধক সম্পত্তি দখল করেছে। ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা মোমিনের বিরুদ্ধেও মামলা করেন। সেই মামলায় মোমিন ইতোমধ্যেই জেলও খেটেছেন। বর্তমানে তিনি জামিনে আছেনও। ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখার বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান তৌহিদ রেজা জানান, মাহিন ফুড এর মালিক জহুরুল হক মোমিন তার কছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে লিমিটেড এর বর্তমান মোট পাওয়া না ৩১ কোটি ৮৩ লাখ ৭০হাজার ৮৯০ টাকা। এর এগিনেস্টে মামলা করা হয়েছিলো ব্যাংক থেকে এনআই ধারায়। ওই মামলায় রায়ও হয়েছে। তবে রায় কার্যকর হয়নি এখনো। পরে আমরা সার্টিফিকেট শাখায় মামলা করেছি। তখন গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিলো। তখন আদালতে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়ে মুসলেকা দিয়েছিলো যে বাকি টাকা ওই বছরের মধ্যেই পরিশোধ করবে। কিন্তু সে আদালতের কাছে দেয়া ওয়াদা এখন পর্যন্ত রক্ষ করেনি। উল্টো সে ওই মামলার বিপরীতে হাইকোর্টে রীট করে সময় ক্ষেপন করছেন। ইতোমধ্যে সে আদালতে রীট করেই ১০ বছর পার করেছে। আদালত যতবারেই ব্যাংকের পক্ষে রায় দেয় ততোবারেই সে রীট করে। মোমিনের করা সর্ব শেষ আফিলও খারিজ করে দিয়েছে আদালত। ইতোমধ্যেই ব্যাংকের কাছে মরগেজ রাখা সম্পত্তি নিম্ন আদালত কর্তৃক দখল সত্ত¡ ব্যাংকে বুঝিয়ে দেয়। পরবর্তীতে সে আবারো আপিল করে। সেই আপিলও আদালত খারিজ করে দিয়েছে। মোমিনের স্ত্রী শিরিন আখতার ঝুনুর কাছে বর্তমানে ব্যাংক পায় ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তিনি আরো জানান, ২০১৮ সালে ১১ জুন মোমিনের স্ত্রী পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তখনও সে আদালতে মিথ্যা বলে আদালত থেকে জামিন নিয়েছে। পরবর্তীতে অর্ধেক টাকা পরিশোধের কথা বললেও এখনো কোন টাকা ব্যাংকে পরিশোধ করেন নি। এই পরিবার বরাবরেই আদালত এবং আইনকে তোয়াক্কা না করেই চলছে। অপরদিকে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড বগুড়া শাখা সূত্রে জানা যায়, রিমা ফ্লাওয়ার মিলের মালিক জহুরুল হক মোমিনের কাছে ব্যাংক ৯ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার এবং তার আপন ভাই নিলয় এন্টারপ্রাইজ এর মালিক এনামুল হক বাবু ৬ কোটি ৭৫ লাখ ৫ হাজার ব্যাংক থেকে জালিয়াতির করে টাকা উত্তোলন করেছেন। এছাড়াও ব্যাংক তাদের কাছে নিয়োগের আরো প্রায় ১৬ কোটি কাটা পাবে। দীর্ঘদিন ধরে তারা ব্যাংকে ওই টাকা ফেরত দিচ্ছে না। ফলে মামলা করা হয়েছে ব্যাংকের পক্ষ থেকে। ওই মামলায় গ্রেপ্তারি পরওয়ানা জারি হলেও ওই দুই ভাই গ্রেপ্তার হচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের টাকাও তোলা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে এই দম্পত্তির সাথে কোন ভাবেই পেরে উঠতে পারছে না ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা তারা লোন নিয়ে নিজেদের অঢেল সম্পত্তি করেছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের সহজ কিস্তির সুযোগ করে দেয়ার প্রস্তাব দিলেও তারা কথা শোনননি। এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা প্রধান আশরাফুল আলম জানান, মোমিন এবং শিরিনকে ব্যাংক থেকে বহুবার ঋণ পরিশোধের জন্য বলা হলেও তারা কোন ভাবেই টাকা ফেরত দেয়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক মামলা করতে বাধ্য হয়েছে। মামলায় ব্যাংকের পক্ষে আদালত রায় দিলেও সেই রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন তিনি। আদালত তার মর্গেজকৃত সম্পত্তি ব্যাংকে দখল করে দিলেও মোমিন পেশি শক্তির বলে সেই সম্পত্তিতে প্রভাব খাটাচ্ছে। জহুরুল হক মোমিনের সাথে কথা বললে তিনি পরিস্কার জানান এ বিষয়ে তার কোন বক্তব্য নেই।

Check Also

রোটারী ক্লাব অব বগুড়ার উদ্যোগে বগুড়ায় বৃক্ষরোপন কর্মসূচী পালিত

মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ,বগুড়া প্রতিনিধিঃ মঙ্গলবার বেলা ১১ টায় যথাযত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বগুড়া সরকারি আজিজুল হক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + eighteen =