সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার দই–এম এম মেহেরুল

ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার দই–এম এম মেহেরুল

বগুড়ার কথা উঠলেই প্রথমে উঠে আসে মহাস্থানগড় আর দই এর কথা।দইয়ের স্বাদ না নিয়ে বগুড়া ছাড়া খুব কষ্টসাধ্য বিষয়। প্রিয়জন বা অতিথি আপ্যায়নে বগুড়ার দইয়ের বিকল্প নেই। বগুড়ার কোনো ভোজ উৎসবের তালিকায় দই নেই এমন কেউই ভাবতে চান না। হোক সে দরিদ্র কিংবা শহরের অতি বিলাসী পরিবার। দই মিশে আছে বগুড়ার প্রাণে প্রাণে।ইতিহাসের সূত্র ধরলে উঠে আসে বগুড়ার বিখ্যাত দইয়ের শুরুর কথা। দইয়ের শুরুটা হয়েছিল বগুড়া শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলায়। কথিত আছে, উনিশ শতাব্দীর ৬০-এর দশকের দিকে গৌর গোপাল পাল নামের এক ব্যবসায়ী প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে সরার দই তৈরি করেন। শেরপুরে দই বানিয়ে ভাঁড়ে করে হেঁটে হেঁটে শহরে চলে আসতেন।দইয়ের সঙ্গে আনতেন সরভাজা। দিনে দিনে তাঁর সরভাজা এতই জনপ্রিয় হয় যে জমিদারবাড়িতেও সরবরাহের আদেশ পান। গৌরগোপালের সরভাজাই কিন্তু পরে সরার দই, মানে বগুড়ার দই হিসেবে সুখ্যাতি পায়। এখন আমরা বগুড়ার দই বলতে যা বুঝি, তা মূলত ওই গৌরগোপালেরই ফর্মুলা। গৌর গোপালের এই দই-ই ধীরে ধীরে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবার ও সাতানী পরিবারের কাছে এ দই সরবরাহ করতেন গৌর গোপাল। সে সময়ে এই দইয়ের নাম ছিল নবাববাড়ীর দই। স্বাধীনতার পর বগুড়ায় দই তৈরিতে শহরের গৌর গোপালের পাশাপাশি মহরম আলী ও বাঘোপাড়ার রফাত আলীর নাম ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ছোট ছোট মাটির পাত্রে দই ভরানো হতো। ঘোষদের ছোট ছোট দোকান থাকলেও তখনো ফেরি করেই দই বিক্রি হতো। গৌর গোপাল ও মহরম আলীর পর বগুড়া দই ঘরের মালিক আহসানুল কবির দই তৈরি ও বাজারজাতে নতুনত্ব নিয়ে আসেন। বগুড়ার দই দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে যে প্যাকেটে দই দেয়া হয় তা শীতকালে থাকে ৪/৫ দিন। আর গরম কালে থাকে ২/৩ দিন। উত্তরাঞ্চলে কোন বিদেশি বেড়াতে এলে তারা ফেরার সময় দই কিনে নিয়ে যান। হাতে হাতে করেই এই দই পৌঁছে যায় বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে বগুড়া শহরের এশিয়া সুইটমিট ও দই ঘর, চেলোপাড়ার কুরানু, নবাববাড়ীর রুচিতা, কবি নজরুল ইসলাম সড়কের আকবরিয়া, বিআরটিসি মার্কেটের দইবাজার, মিষ্টিমহল, সাতমাথার দইঘর, মহরম আলী, শেরপুর দইঘর, চিনিপাতাসহ অর্ধশতাধিক শো রুমে দই বিক্রি হচ্ছে। এসব দই ওজন দিয়ে বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় প্রতিপিস হিসেবে। দই তৈরির যাবতীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে দিগুণ, এ কারণে দইয়ের দামও বেড়েছে।বগুড়ার শো-রুম গুলোতে বিভিন্ন স্বাদের দই পাওয়া যায়। মিষ্টি দইয়ের পাশাপাশি বিক্রি হয় টক বা সাদা দই। লোকে বলে ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথও বগুড়ার দইয়ের স্বাদ নিয়েছেন। আরো শোনা যায়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বগুড়া বেড়াতে গিয়ে দই খান এবং উপঢৌকন পাঠান ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কাছে। বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি প্রথম ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে ১৯৩৮ সালে। তখন বাংলার গভর্নর ছিলেন স্যার জন এন্ডারসন। তিনি নওয়াববাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। তাঁকে কাঁচের বাটিতে দই খেতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি মুগ্ধ হয়ে এ দই ইংল্যান্ডে রপ্তানির পরিকল্পনা করেছিলেন।
বর্তমানে বাজারে মাটির তৈরি সরা ও খুঁটিতে দই বিক্রি হচ্ছে। ৬শ গ্রাম ওজনের দইয়ের মূল্য (সরা বাদে) ১২০ টাকা থেকে ২শ টাকা পর্যন্ত। দইয়ের রয়েছে হরেক রকম নাম, সাধারণ দই, স্পেশাল দই, শাহী দই, চিনিপাতা দই,চিনিছাড়া দই। দইকে কেন্দ্র করে এলাকায় গড়ে উঠেছে দুধের বাজার।
কারিগররা জানান, প্রতিদিন দুপুরে বাজার থেকে দুধ কিনে তাতে চিনি দিয়ে পরিমাণ মতো জ্বাল দেয়া হয় বিশালাকার ভাণ্ডের ভেতর। এরপর সন্ধ্যায় মাটির পাত্রে পরিমাণ মতো জ্বাল দেয়া দুধ ঢেলে দিয়ে বিশাল ঢাকা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। সকালে সেসব দই সরবরাহ করা হয় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকায়।

এম এম মেহেরুল
সাবেক চেয়ারম্যান, আলোর প্রদীপ ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিবেদক-বাঙালি বার্তা
ই-মেইলঃ meharul.islam.1991@gmail.com

Check Also

কবিতার মহারাজ—আজাদুর রহমান

কবিতা আমার মহারাজ, আমি তার গোলাম। না জানা লোকের মত অজ্ঞাত কাগজ কলম নিয়ে থাকি, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + four =