সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / করোনাকাল, নতুন শিক্ষা ও মানবিকতা—ইকবাল কবির লেমন

করোনাকাল, নতুন শিক্ষা ও মানবিকতা—ইকবাল কবির লেমন

মহামারী করোনায় বদলে গেছে পৃথিবী। প্রকৃতির কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে মানুষ। সকল প্রচেষ্টাকে অষাঢ় করে প্রতিদিন প্রকৃতির কাছেই আত্মসমর্পণ করছে মানুষ নামের হাজারো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণি। ইতোমধ্যেই এ সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছে গেছে।
প্রকৃতির এ বৈরি আচরণে মনুষ্য প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরে পেয়েছে প্রাণ। সাগর, মহাসাগর ও নদী ফিরে পেয়েছে তাদের হারানো রং। প্রায় হারিয়ে যাওয়া হাঙর-ডলফিন এখন নৃত্য উল্লাসে সমুদ্র অববাহিকায়। কমেছে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ। পাখিদের কিচির মিচিরে মুখরিত হয়ে উঠেছে বনজঙ্গল, আমাদের আঙিনাসহ লোকালয়ের সর্বত্র। করোনার ধাক্কায় কমে গেছে শব্দ দূষণ।
করোনা মহামারীর কারণে অবরুদ্ধ সময়ে মানুষ পরিবারের সদস্যদের সাথে ব্যয় করতে পাচ্ছে অতিরিক্তি সময়। এতে করে পারিবারিক মেলবন্ধন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ছোট্ট শিশু দূরে থাকা বাবাকে কাছে পেয়ে তার বুকের জমিনে শুয়ে, ঘাড়ে চড়ে আদায় করে নিচ্ছে তার কাক্সিক্ষত তৃপ্তি।
মারাত্মক এ ভাইরাসটিই মানুষকে শিখিয়েছে শিষ্টাচার। সারাজীবন শিষ্টাচার বলতে আদব কায়দাকেই বুঝলেও অনেকেই বুঝতাম না যে, হাঁচি-কাশি দেয়ারও একটা শিষ্টাচার আছে, এবং যে শিষ্টাচারটি আমাদের সকলের জন্যই অত্যন্ত জরুরী। আবার অনেকেই ওই শিষ্টাচার সম্বন্ধে জানলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ করেননি অথবা অন্যদেরকে সে সম্পর্কে ধারণা দেননি। এখন আমরা হাঁচি-কাশি দিলেই টিস্যু অথবা রুমাল ব্যবহার করি। টিস্যু বা রুমাল না থাকলে কনুইয়ের ভাজে হাঁচি দেই।
আমরা আগে ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধোয়া এবং খাওয়ার পরে হাত ধোয়ায় অভ্যস্ত ছিলাম। খাওয়ার আগে খুব কম লোকই আমরা হাত ধুতাম। কিন্তু করোনা আমাদের সাবান দিয়ে ঘনঘন হাত ধুয়ে জীবানু তাড়ানোর একটি ভাল শিক্ষা দিয়েছে। এখন আমরা একটু সুযোগ পেলেই ২০ সেকেন্ড সময় ধরে হাত ধুয়ে নিচ্ছি। হাত ধোয়ার জন্য এখন সর্বত্রই পানি ও সাবান রাখার ব্যবস্থাপনাও লক্ষণীয়। অফিস আদালত বা অন্য কোন দপ্তরে গেলে আমরা ওই দপ্তরে ঢোকার আগে হয় সাবান দিযে হাত ধুয়ে নিচ্চি নয়তো পকেট থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বের করে হাতে লাগাচ্ছি। হাতকে জীবানুমুক্ত রাখতে আমরা হ্যান্ড গেøাভস্ও পড়ছি।
শুধুমাত্র উষ্ণ আবহাওয়ায় ধুলাবালির হাত থেকে বাঁচতে আমাদের কেউ কেউ মুখে মাস্ক পড়লেও এখন আমরা অধিকাংশ মানুষ মুখে মাস্ক পড়ছি ও ক্ষতিকর ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করছি।
একটা নির্দিষ্ট দুরত্ব মেনে চললে আক্রান্ত বা অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষতিকর উপাদানগুলো আমাদের স্পর্শ করতে পারবেনা সেটিও আমরা করোনাকালে ভালভাবে শিখেছি এবং অনেকেই তা মানার চেষ্টা করছি।
সংকটকালে ধর্মীয় বিধিতেও যে সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে এবং হওয়া জরুরী সে সম্বন্ধে বিষদ শিক্ষা দিয়েছে করোনাকালীন সময়।
করোনার এ মহা বিপর্যয়ে পরিবর্তনের হাওয়ায় মানুষ আরও মানবিক হবে, দূর হবে মানুষের পশুত্ব, জয় হবে মানবতার, মানবিকতার, এমনটি মনে হলেও আসলেই কি তাই হয়েছে? মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষগুলো মানবিকতায় অবিচল থাকলেও দুর্যোগকালে আমরা কি দূর করতে পেরেছি আমাদের অমানবিকতা?
সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে করোনার দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব, সংশ্লিষ্ট সরকারের বিভিন্ন বিভাগ। পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট, সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব, আনসার বাহিনী, অন্যান্য সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য, দায়িত্বশীল ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, স্বেচ্ছাসেবী, সাংবাদিকসহ মানুষের দুর্দশায় মন কাঁদে এমন শ্রেণির মানুষ। স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার, করোনার কারণে কর্মহীন ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রীসহ অন্যান্য সহায়তা। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এ মন্ত্রে বলিয়ান হয়ে কোন চাওয়া পাওয়ার প্রত্যাশা না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছে স্বেচ্ছাসেবীরা। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে মানবতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন একটি বিশেষ শ্রেণি। করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবা করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে নিজে আক্রান্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন অনেক ডাক্তার, নার্স, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সেনাবহিনী, পুলিশবাহিনী, আনসার বাহিনীর সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী সদস্য। ইতোমধ্যেই তাদের অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তারপরেও থেমে থাকেনি মানবতা। এগিয়ে চলেছে মানবিক মানুষগুলো মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে।
অন্যদিকে করোনার এ দুঃসময়ে আমরা মানুষের একটি শ্রেণিকে দেখেছি চরম অমানবিক হতে, বিবেকবোধ বিসর্জন দিয়ে পশুত্ব প্রদর্শন করতে। করোনাকালে অসহায় মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে কোথায় কে করোনা আক্রান্ত হয়েছে সে বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তাদের হেনস্তা করতেই তারা বেশি উৎসাহী ও তৎপর। তাদের অপতৎপরতায় করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারকে পার করতে হয়েছে এবং হচ্ছে মানসিক নির্যাতন। করোনা যে কাউকে বেঁছে বেঁছে ধরেনা এবং তারা নিজেও যে করোনায় আক্রান্ত হতে পারে এ বিষয়টি তারা বেমালুম ভুলেই গেছে। তাইতো পাড়া মহল্লায় অসুস্থ মানুষ ও তার পরিবারকে সহায়তা না করে নোংড়ামিতে মেতে ওঠে তারা। পাশাপাশি অসহায় মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি দান-অনুদান আত্মসাতে এদের প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মতো।
শুধু তাই নয়, মানবিক মূল্যবোধের অভাবগ্রস্ত এ শ্রেণি নিজের করোনা আক্রান্ত মা-বাবাকে, বোনকে, ভাইকে ফেলে যায় বনে বাঁদাড়ে, রাস্তায়, হাসপাতালে। যে বাবা সারাজীবন কষ্ট করে লালন করেছে তার সন্তানকে অথবা যে মা সবসময় আরাধনা করেছে তার সন্তানের মঙ্গল কামনা করোনায় মৃত সেই বাবা-মাকেও মৃত্যুর পর দেখতে, কবর দিতে অনিহা প্রকাশ করেছে অমানবিকতার চর্চাকারী সেই অমানুষরা।
করোনাকালের অর্জিত শিক্ষাকে বাস্তবজীবনে কাজে লাগাতে হবে। অনুসরণ করতে হবে মানবিক মূল্যবোধকে, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আদর্শ মানুষগুলোকে। শুদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে মানুষের পাশে, অমানবিকতাগুলোকে দিতে হবে নির্বাসন। তবেই জয় করা যাবে যেকোন দুর্যোগ।

ইকবাল কবির লেমন-সম্পাদক,বাঙালি বার্তা, কলেজ শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী।

Check Also

খেলাঘর সোনাতলা উপজেলা শাখার ওয়েবসাইটের উদ্বোধন

রবিউল ইসলাম শাকিল (শিক্ষানবিশ স্টাফ রিপোর্টার):রবিবার বিকাল ৪ টাই হাসনাহেনা খেলাঘর আসর এর কার্যনির্বাহী সদস্য …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × two =