সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / গাইবান্ধার খবর / করোনার থাবায় জবুথবু কোচাশহর পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা

করোনার থাবায় জবুথবু কোচাশহর পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা

মনজুর হাবীব মনজু, গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) : ঐতিহ্যবাহী মৃৎসামগ্রী উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুদিন ফিরিয়ে আনা গাইবান্ধা জেলার সর্ববৃহৎ মৃৎশিল্পপল্লী গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহরের পালপাড়ায় আবার জাঁকিয়ে বসছে দুর্দিনের কালোছায়া। করোনার ভয়াল থাবায় মৃৎপন্যের গ্রাহক না থাকায় গত দেড় বছরে তাদের আয় নেমেছে শূন্যের কোঠায়। নতুন করে সৃষ্ট এ সমস্যায় চোখে আঁধার দেখছেন তারা। গোবিন্দগঞ্জ-মহিমাগঞ্জ সড়কের কোচাশহর বাজার এলাকায় অবস্থিত নিত্যদিনের কর্মব্যস্ত পালপাড়ার এখন এক রকম জবুথবু অবস্থা। রোববার সেখানে গিয়ে দেখা যায় এ চিত্র।
কোচাশহর পালপাড়ার বাসিন্দারা জানান, গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে আধুনিক তৈজসপত্রের সাথে কুলোতে না পেরে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিলো তাদের পৈত্রিক পেশা ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈরি তৈজসপত্রের উৎপাদন। তখন পেটের দায়ে অনেকেই পেশা বদলে চলে গিয়েছিলেন অন্য পেশায়। একবারে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এ পেশার কিছু মানুষ রিক্সা-ভ্যান চালনা থেকে শুরু করে হোটেল শ্রমিকের কাজ করতেও বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু দেশে নার্সারি ব্যবসা বাড়ার সাথে সাথে মাটির তৈরি টবের চাহিদা বাড়তে থাকে আবার। এ কারণে দশ-পনের বছর আগে তারা আবার ফিরে আসতে শুরু করেন তাদের মূল পেশায়। টবের পাশাপাশি দইয়ের হাঁড়ি, সরা ও কাপ, মাটির ব্যাংক, কুয়োর পাট এবং মাটির খেলনার নতুন করে ব্যাপক চাহিদা মেটাতে তারা এসব তৈরিতে আধুনিক প্রযুক্তিও ব্যবহার শুরু করেন। আগে যেখানে হাতে মাটি ছেনে কাদার তাল তৈরি করে হাতে ঘোরানো চাকে ফেলে তৈজসপন্য বানানো হতো। এতে শুধুমাত্র দিনের আলোতে খুব সামান্য সংখ্যক মালামাল তৈরি করা যেত। বর্তমানে ইলেকট্রিক মোটর দিয়ে মেশিনে কাদা ছেনে নিয়ে ইলেকট্রিক চাকে খুব কম সময়ে ও কম পরিশ্রমে দিন-রাত কাজ করে বিপুল সংখ্যক মৃৎপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়। আর এর ফলে মাত্র এক যুগের ব্যবধানে বদলে যায় এ পল্লীর মানুষের জীবনযাত্রা। খড়ের ঘরের জায়গায় এ পাড়ায় এখন অধিকাংশ বাড়িতেই পাকা ঘর স্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে অনেক ঘরই ছাদ পেটানো এবং দোতালা। বাড়ির উঠোন আর রাস্তার পাশের্^র খালি জায়গার পাশাপাশি এ সব ঘরের ছাদেও শুকানো হয় কাঁচা মাটির পন্য। কিন্তু গত বছরের মার্চ মাস থেকে করোনার কারণে মাটির তৈজসপত্র বিক্রিতে ভাটা পড়তে শুরু করে। দীর্ঘ এ করোনাকালে ঘরে জমানো টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে সমস্যায় সম্মুখিন হয়েছেন তারা।
কোচাশহর পালপাড়ার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক প্রদীপ পাল জানালেন, একশ’ ত্রিশ পরিবারের প্রায় দেড় হাজার বাসিন্দার এ পাড়ায় বিভিন্ন বয়সী পাঁচ শতাধিক মানুষ এ পেশার সাথে জড়িত। এখানকার ৫০টি চুল্লিতে মাসে চার-পাঁচ বার করে বিভিন্ন ধরনের মাটির তৈরি সামগ্রী পোড়ানো হতো। এতে কমপক্ষে দুই-আড়াইশ’ দফায় উৎপাদন হতো দুই থেকে তিন লক্ষ টাকার মৃৎসামগ্রী। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও পাশর্^বর্তী বগুড়া জেলায় এগুলো বিক্রি হতো। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে হোটেল ও মিষ্টি কারখানা গুলো অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকায় দইয়ের হাঁড়ি, সরা ও কাপ বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ঈদ, পূজো আর বৈশাখী মেলা বন্ধ থাকা একটি বড় ধাক্কা খেলনা আর হাড়ি-পাতিল বিক্রিতে। একই অবস্থা নার্সারীর টব বিক্রিতেও। বর্তমানে ৫০ টি চুল্লির মধ্যে ১৫ থেকে ২০ টি চুল্লিতে মাসে এক-আধবার আগুন দেয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে সামান্য সংখ্যক মাটির তৈজসপত্র উৎপাদন হয়্। সে গুলিও সময় মত ও ন্যায্যমূল্রে বিক্রি করা সম্ভব হয় না। এর ফলে তাদের আয় নেমে গেছে শূন্যের কোঠায়। টানা দেড় বছরের করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে গাইবান্ধা জেলার সর্ববৃহৎ এ মৃৎশিল্পপল্লীর বলে জানালেন লিটন পাল, নিরঞ্জন পাল, সুকুমার পাল প্রমূখ। এ পাড়ার মৃৎপন্যের ব্যবসায়ী সুকোমল পাল অভিযোগ করে জানালেন, কোচাশহর ও মহিমাগঞ্জে দুটি দোকান চালিয়ে তিনি বছরে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা আয় করতেন। কিন্তু করোনায় গত দেড় বছরে আয় দূরে থাক, উল্টো বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে দুই লাখ টাকা।
পালপাড়ার ক্ষুদ্র মৃৎসামগ্রী উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা আশংকা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সরকারি কোন প্রণোদনা বা সহজ ঋণ না পেলে তাদের পথে বসতে হবে। তবে করোনার এ দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি ও সরকারি সহায়তা পেলে দ্রুতই উৎপাদন ও বিপণনে ফিরে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তারা।

Check Also

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে জান্নাত ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৃদ্ধাশ্রমে খাবার বিতরণ

স্টাফ রিপোর্টারঃ গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সামাজিক সেবামূলক সংগঠন ❝জান্নাত ফাউন্ডেশন❞ এর উদ্যোগে মেহেরুন্নেছা বৃদ্ধাশ্রম পলাশবাড়ীতে অবস্থারত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 2 =