সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / করোনার বৈশ্বিক প্রভাব ও উত্তরণ— মোঃ হাবিবুর রহমান

করোনার বৈশ্বিক প্রভাব ও উত্তরণ— মোঃ হাবিবুর রহমান

বিশ্বায়নের পরিব্যাপ্তি দ্রুতই করোনা ভাইরাসকে মানব সভ্যতার প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। মহামারী এ ভাইরাস প্রতিনিয়তই গ্রাস করছে মানুষের জীবন। ফলে দীর্ঘ হচ্ছে মানুষের মৃত্যু মিছিল। মানুষ জীবনের পাশাপাশি জীবিকাও হারাচ্ছে। বিশ্বায়নের সংস্পর্শে এসে করোনা মানুষের জীবন ও জীবিকা উভয়কেই গ্রাস করছে। কবে থামবে করোনার এ মহাযাত্রা? কেউ জানেনা।বিশ্বব্যাপী এই মহামারীর জন্য কে দায়ী তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক উদ্ভব না হওয়ায় অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের কবলে আজ গোটা বিশ্ব। সহযোগী অবস্থান থেকে দেশগুলো অর্থনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে একে অন্যেকে পারস্পরিক সহযোগিতা করে যাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম। দেশ গুলোর পারস্পরিক নির্ভরশীলতার পরিধি দিনদিনই বেড়ে চলেছে। কোভিড-১৯ এর জন্ম চীনের উহান প্রদেশে হলেও যোগাযোগ ও আধুনিকতা এবং বৈশ্বিক সামগ্রকিতার প্রভাবে দ্রুতই সর্বত্র এর বিস্তার লাভ করে। সমগ্র বিশ্বে ৫২ লক্ষ মানুষ এ ভাইরাসের কবলে এবং ইতোমধ্যে ৩ লক্ষ ৩২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।বাংলাদেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে তম্মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৩২ জনের । মৃত্যুর এ ভয়াবহতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দেশগুলো একের পর এক গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কোভিড- ১৯ এর ধ্বংসাত্মক ছোবলে অর্থনীতির সকল উন্নয়ন সূচক আজ নিম্নমুখী। অর্থনৈতিক মন্দার দিকে রাস্ট্রগুলো অগ্রসর হচ্ছে।

১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে সারা বিশ্বে পাঁচ কোটিরও অধিক মানুষ প্রাণ হারায়। এরপরে ১৯৩০ সালে শুরু হয় বিশ্বমন্দা যা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সম্প্রতি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-(এডিবি )কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয় বিশ্বে করোনার ক্ষতিকর প্রভাবে ২৪ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। এছাড়া বিশ্ব অর্থনীতির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ ধস নামতে পারে যেখানে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার অনুমান করা হয়েছে। মানুষের জীবন ও জীবিকা আজ বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে করোনা সহসাই আমাদের মাঝ হতে বিদায় নিবে না। করোনা সহনশীল জীবন যাপন চর্চায় অভ্যস্ত হতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হতে রক্ষা পেতে সরকারি পর্যায়ে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় বিভিন্ন খাতে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন যা জিডিপির ২.৫২ শতাংশ। এই সংকট মোকাবেলায় স্বল্প মেয়াদী, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। বৈশ্বিক এ সংকট উত্তরণের উপায়গুলো তুলে ধরা হলোঃ

সামগ্রিকতারও সহযোগিতার ক্ষেত্রে রাস্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামো আজ প্রভাবিত, তাই বৈশ্বিক নির্ভরশীলতাহতে বেরিয়ে আমাদের আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। বিশ্বব্যাপী চাকরির বাজার সীমিত হওয়ায় প্রবাসীরা দেশে ফেরত আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি হ্রাস পাবে। আমাদের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মহামারী মোকাবেলার দৃষ্টান্তগুলো পর্যালোচনা সাপেক্ষে স্থানীয়করণের কর্মপন্থা তৈরী করতে হবে। কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারী শ্ল্পি, কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষি পণ্যের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমঘন শিল্পের বিকাশ সাধনের উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে জীবিকায়নের ক্ষেত্রগুলোকে আরও সচল ও সম্প্রসারিত করে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রণোদনা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা হতে সাহায্য বা অনুদান প্রদান দীর্ঘ সময়ব্যাপী পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তাইতো মানুষের কর্মসংস্থানের পথ সুগম করার মধ্য দিয়ে আত্মনির্ভরশীল করা হয়। লকডাউন ব্যবস্থা করোনা ভাইরাস ছড়াতে বাঁধা প্রদান করলেও চলমান অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই ক্রমান্বয়ে লকডাউন ব্যবস্থাকে শিথিল করে স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসতে হবে।

উন্নয়নশীল দেশে দুর্যোগ ও মহামারির প্রভাবে প্রথমেই ভুক্তভোগী হয় শ্রমজীবি মানুষ । তারা দিন আনে দিন খায় ব্যবস্থায় অভ্যস্ত। স্বল্প আয়ের এ মানুষ গুলোর বাঁচার করুণ আকুতি দ্রুতই ফুটে উঠে। লকডাউনে কর্মহীন মানুষগুলোর সীমিত সঞ্চয় অতিদ্রুতই ফুরিয়ে যাওয়ায় এবং কাজ নাথাকায় মানবিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে । সরকার এ সকল মানুষের কাজের পথ সুগম করতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ বিভিন্ন ধরণের প্রণোদনা প্যাকেজ হাতে নিয়েছে। খাদ্য সাহায়তা, নগদ অর্থ সহায়তা এবংসহজ শর্তে বা বিনা সুদে ঋণপ্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। উন্নয়নের মূল স্রোতধারাকে এগিয়ে নিতে নারীদেরকে সার্বিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা অবশ্যম্ভাবী। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে মানব সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। নারী উদোক্তা তৈরীতেঋণ সহায়তা প্রদান করে তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্বায়নের প্রভাবে স্বল্পতম সময়ে দ্রুত করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য ইমিগ্রেশন, পর্যটন ও ভ্রমণ ব্যবস্থাকে দায়ী করা হচ্ছে। ফলে এসকল খাতে কর্মসংস্থানের পরিধি সীমিত হয়ে আসছে । এ পরিস্থিতি সামলে উঠতে বেশ সময় লাগবে এটি নিশ্চিত। আমাদেরকে রেমিট্যান্স ও তৈরী পোশাক শিল্পের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে বহুমূখী পণ্যের রপ্তানী বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। সেক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় পাট, চামড়া, চা ও ঔষধ শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। সরকারের চলমান উন্নয়নমূলক মেগা প্রকল্পসমূহ জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তাই এসব প্রকল্পসমুহের অগ্রগতির অব্যহত ধারা সচল রাখতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে মহামারী মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। জনবহুল এ দেশে রোগীর সংখ্যা বেশী। দেশের জনসংখ্যা ও রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামাদি, টেকনিশিয়ান, নার্স ও ডাক্তারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে মাঠ প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি, মিডিয়াকর্মী, সৎকার কাজে নিয়োজিত টীম, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলসভাবে দিন-রাত কাজ করছেন যা আমাদেরকে জাতি হিসেবে গর্বিত করেছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ হচ্ছে। কাম্য ও পরিকল্পিত জনসংখ্যাই সম্পদ। তাই পরিকল্পিত পরিবার গঠন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবী ।
করোনা আক্রান্তদের প্রতি সামাজিক নিগ্রহও অসৌজন্যমূলক আচরণ আমাদের নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে ফেলে যাওয়া বা করোনায় মৃত্যুবরণকারীকে রেখে স্বজনদের পলায়নের ঘটনা আমাদের হৃদয়স্পর্শ করেছে। অপরদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই এ মহাবির্পযয়ে এগিয়ে এসেছে, তাদেরকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিকপর্যায় হতে দায়িত্ববোধের শিক্ষার চর্চা করতে হবে।
খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় কৃষি জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হওয়া দরকার। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ও অধিকতর উৎপাদনশীল কৃষিতে আমাদের মনোযোগ বেড়েছে ।তবে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে শারিরীক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি ও ভিটামিন সম্মৃদ্ধ দেশীয় ফলের উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। চাহিদার সাথে মিল রেখে কৃষি পণ্যের আমদানী না বাড়িয়ে দেশীয় উৎপাদনে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন । দেশের মোট খাদ্য চাহিদার সাথে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সুসমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষা খাতে আইটি, কারিগরি, ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সব ছাত্র-ছাত্রীকে ন্যুনতম দশম শ্রেণি পর্যন্ত এ সকল বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতে হবে।
ডিজিটাল ও তথ্য প্রযুক্তির সুবিধার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইননির্ভর সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রদানের হার ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। এতে সুশাসন নিশ্চিত হবে পাশাপাশি জবাবদিহিতা বাড়বে। অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম ও ই-কমার্সের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এ সকল খাতকে আরো এগিয়ে নিতে হবে।
করোনার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। সর্বোপরি নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইসিটি, কর্মসংস্থান ও মানবিক-মূল্যবোধ খাতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে দেশ সম্মৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে- এ প্রত্যাশা করি।

(মোঃহাবিবুররহমান-উপসচিব,মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ই-মেইলঃ habib.mopa@gmail.com)

Check Also

মুক্তির অপেক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের চলচিত্র “একজন মহান পিতা”

নির্মিত হলো মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‘একজন মহান পিতা’। চলচ্চিত্রটি গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন বরেণ্য নির্মাতা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − 13 =