সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / করোনায় লকডাউন ও সচেতনতার শিক্ষা—মো. হাবিবুর রহমান

করোনায় লকডাউন ও সচেতনতার শিক্ষা—মো. হাবিবুর রহমান

জীবন ও জীবিকার তাগিদে আর কতদিন লকডাউন চলবে, সে প্রশ্ন আজ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে কোটি মানুষের মুখে মুখে। জীবন বাঁচলে জীবিকা নাকি জীবন বাঁচাতে জীবিকা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আজ দোদুল্যমান। করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ মহামারীতে গোটা বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত। পৃথিবীব্যাপী এ ভাইরাসকে কেউ স্বাগত না জানালেও প্রতিহত করতে পারেনি। অদৃশ্য এ শত্রুর বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব একাত্ম হয়ে লড়ে যাচ্ছে, সাফল্য কবে আসবে তা কারো জানা নেই । মহামারী এ ভাইরাস শিক্ষা দিয়েছে ক্ষমতা, প্রভাব, অহংকার, খ্যাতি, যশ কোন কিছুই শাশ্বত নয়।উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তিতে বলিষ্ঠ মার্কিন পরাশক্তিই আজ সবচেয়ে বেশী পর্যুদস্থ। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর মিছিল ক্রমশই বাড়ছে।

করোনা মহামারীতে বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩ লাখ ৫২ হাজার। তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে, যা বিশ্বের মোট মৃত্যুর শতকরা ২৮.৫৫ ভাগ। বাংলাদেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৬৭৫১ জন। তম্মধ্যে ৫২২ জন মৃত্যুবরণ করেছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় এ মৃত্যুর হার কম যা ১.৪২% এবং ইতালীর ক্ষেত্রে এ হার সর্বোচ্চ যা ১৪.২৫%। পৃথিবীর অনেক দেশেই সনাক্তের ৬৫-৭০তম দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার নিম্নমুখী হয়েছে এবং ৩ মাস পর লকডাউন শিথিল করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৮০তম দিন অতিবাহিত হলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উর্ধ্বমূখী লক্ষ্য করা যাচ্ছে । আমাদের অসচেতনতা আর খামখেয়ালীপনার মাশুল দিতে এ প্রবণতা কতটা দীর্ঘায়িত হয় তা দুশ্চিন্তার বিষয়। অন্যদিকে বিদেশ ফেরতদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখতে পারা, লকডাউন পুরোপুরি অনুসরণ করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সচেতনতার ফলে ভিয়েতনাম “জিরো” মৃত্যুহার নিয়ে এ দুর্যোগ মোকাবেলায় সফল হয়েছে, যা অনেকের কাছেই আজ অনুকরণীয়।

বাংলাদেশে আক্রান্ত রোগীদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সর্বোচ্চ আক্রান্তের হার ২১-৩০ বছরের মধ্যে ২৬%, এরপরেই রয়েছে ৩১-৪০ বছরের মধ্যে ২৪%। যুব সমাজের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দুরত্ব না মানা, লকডাউন না মানা, কর্মের তাগিদে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মত অধিক সংক্রমিত এলাকায় যাতায়াত, নানা অজুহাতে ঘর থেকে বের হয়ে অবাধে চলাফেরা করার জন্য এ হার বেশি হয়েছে মর্মে ধারণা করা হয়। তবে, আইইডিসিআর এর তথ্য মতে যুবদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি হলেও ৬০+ বছর বয়সের মধ্যে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশী ৪২% । এ ভাইরাসটির চরিত্রগত বৈশিষ্ট স্থানভেদে ভিন্নতর পরিলক্ষিত হয়েছে। এমনকি উপসর্গ ছাড়াই এ রোগটি বিস্তার লাভ করায় জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ৪০% রোগীর কোন উপসর্গ নেই।
ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হবে ২.৯% যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। করোনা সংকটে যাতে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক ক্ষতি না হয় সেজন্য সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীশুরুতেই ঘোষণা দিয়েছেন, করোনা ভাইরাস মোকাবেলাও একটি যুদ্ধ। আমরা এ যুদ্ধে জয়ী হবই, ইনশাল্লাহ। নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি করোনামোকাবেলায়সকলকে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এ সংকট উত্তরণে রপ্তানীমুখী শিল্প খাত, ব্যাংকিং, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে নানাবিধ প্রণোদনা ও কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন ।
করোনার প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় লকডাউন অবস্থায় অর্জিত শিক্ষা আমাদেরকে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাস্ট্রীয় পর্যায়ে জীবনযাত্রায় নতুন পথ দেখিয়েছে। নোভেল, লকডাউন, ঘরে থাকুন, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, ভেন্টিলেশন, আইসিইউ, শারিরীক দুরত্ব,সামাজিক দুরত্ব, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী বা পিপিই, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন, প্যান্ডেমিক, সম্মুখ যোদ্ধা, মানবিক যোদ্ধা, করোনা যোদ্ধা, মানবতার ফেরিওয়ালাইত্যাদি শব্দগুলোর বহুল ব্যবহার ও প্রয়োগ আমাদের জ্ঞানজগতকেব্যাপকভাবে সম্মৃদ্ধ করেছে ।
ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, হাঁচি, কাশি ও থুথু শিষ্ঠাচার মেনে চলা, গণপরিবহন, জনসমাগম ও ভিড় এড়িয়ে চলা, নাক-মুখ-চোখ স্পর্শ না করা, হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করা, ন্যুনতম ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, হ্যান্ডশেক ও কোলাকুলি হতে বিরত থাকা, শারিরীক ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা, ঘরে থাকা ইত্যাদি চর্চাগুলো আমাদেরকে সুস্থ জীবন যাপনে শিক্ষা দিয়েছে।গৃহস্থালির কাজে পুরুষদের সহযোগিতার মাত্রা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। গৃহপরিচারিকা ছাড়া যাদের একবেলাও চলত না সেসব মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারে এখন নিজেদের কাজ নিজেরাই করতে শিখেছে।বই পড়া, বাসা গোছানো ও প্রিয়জনদের সাথে মোবাইলে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোঁজখবর নেয়া হয়েছে। আবার অনেকেই মনে করেনপরিবারের বাইরে বিবাহ বহির্ভূত মেলামেশার সুযোগ বন্ধ হওয়ার ফলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়েছে। সমাজে অপরাধের মাত্রা বহুলাংশে কমেছে। গলির মোড় বা পাড়ার চায়েরদোকানে আড্ডা নেই বললেই চলে। মানুষ জরুরী প্রয়োজনে ঘর হতে বের হলেও দ্রুতই আবার ঘরে ফিরছে। পারিবারিক ও সামাজিক এসব শিক্ষা আমাদের বৃহত্তর কল্যাণার্থে প্রভাব ফেলছে।
অনলাইনের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের দৈনন্দিন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সভা ও আলোচনা সম্পন্ন করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই স্কুলের ক্লাস ও কোচিং ক্লাসের সুযোগ পেয়েছে। শিক্ষকগণের মাঝেও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার আগ্রহ বেড়েছে। করোনাকালে ঘরে বসে একঘেয়েমি কাটাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ সময় ইন্টারনেটের ব্যবহারবহুলাংশে বেড়েছে।লকডাউনে অধিকাংশশপিংমল বন্ধ থাকায় এবং বাইরে চলাফেরায় ঝুঁকি থাকায় ই-কমার্স বা অনলাইনে কেনা-কাটা বৃদ্ধি পেয়েছে। নগদ ক্যাশে লেনদেন এর পরিবর্তে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে লেনদেনের প্রতি মানুষের আস্থা ও ঝোঁক উভয়ই বেড়েছে। ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে জনগণকে আইনগত সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
করোনা মেকাবেলায় মাঠ প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি, মিডিয়াকর্মী, সৎকার কাজে নিয়োজিত টীম, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সাহসী দায়িত্ব পালন ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সৎকার কাজেঅংশগ্রহণের ঘটনাগুলো আমাদেরকেভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে দায়িত্বশীলতার, মানবিকতার ও সামাজিক সম্প্রীতির উজ্জলতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।এছাড়ামানবিক সংকট মোকাবেলায় অনেকেই অবদান রেখেছেন। যে বাড়ীর মালিক ভাড়াটিয়ার ভাড়া মওকুফ করেছে, কাজ না করেওযে পরিবার তার গৃহপরিচারিকার মাসিক বেতন প্রদান করেছে, যেসব শিক্ষার্থীরা তাদের টিফিনের সঞ্চয়কৃত অর্থ অসহায়দের মাঝে বিতরণ করেছে তাদের অবদানও স্মরণীয়।
মানবিক আইকন শেরপুরের ভিক্ষুক নজিম মিয়া তার দীর্ঘদীনের সঞ্চয়কৃত অর্থ রাস্ট্রীয় কোষাগারে তুলে দিয়ে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। গরীব ও অসহায়দের ঈদ উপহার সামগ্রী, খাদ্য ও নগদ সহায়তা প্রদানে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রসংশার দাবীদার। এছাড়া অনেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীয় ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে অনুদান প্রদান করে মানবিক সংকট মোকাবেলায় নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করেছেন। আবার অনেকেই ঈদ শপিংয়ের অর্থ গরীব ও অসহায়দের মাঝে বিতরণ করে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেছে।
মানুষের সাহায্য ছাড়াই প্রকৃতি দ্রুত নিজেকে পরিশুদ্ধ ও দুষণমুক্ত করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে পারে- প্রকৃতির সেই শিক্ষার মর্ম আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি। তাইতো প্রকৃতির প্রতি বিরূপ আচরণ না করে প্রকৃতিপ্রেমী হতে হবে। ভিটামিন সমৃদ্ধ ফলমূল ও শাকসব্জি খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে ফলে করোনার মত ভাইরাস আক্রমণ করতে পারে না। করোনা প্রতিরোধ ও আক্রান্তদের চিকিৎসায় দেশীয় টোটকা পদ্ধতি কাজে লেগেছে। করোনা থেকে মুক্তি পেতে লেবু, আদা, সরিষার তৈল, লং, কালোজিরা, তেজপাতা, এলাচি, দারচিনি, গোলমরিচ, গরম পানি ও চা পান ইত্যাদির প্রতিমানুষের আস্থা বেড়েছে। এসব ক্ষেত্রে হতে অর্জিত শিক্ষা সুস্থ পরিবেশ ও নিঃরোগ জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য।
বিদেশফেরতরা হোম কোয়ারেন্টাইনে গিয়ে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অবাধে চলাফেরা করেছে, পবিত্র রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে সীমিত পরিসরে শপিংমল খোলা হলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছোট্ট সন্তানদের সাথে নিয়ে শপিং করেছে, অনেকেই রোগ গোপন করে আক্রান্তের হার বাড়িয়েছে, ঈদে ঘরমুখী মানুষের ঢল লক্ষা করা গেছে। আইনের কঠোরতম প্রয়োগের মাধ্যমে এসব সামাজিক অনিয়মরোধে সুফল পাওয়া দুষ্কর। তাই সচেতনতাই একমাত্র হাতিয়ার যার মাধ্যমে এসব সামাজিক অন্ধকার দূরীভূত করা যায়।আর করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সচেতনতাই এ রোগের বিস্তাররোধে একমাত্র মোক্ষম হাতিয়ার। যার সাথে কোন আপোষ নেই। সমাজে ৯৯ জন মানুষ যদি সচেতন হয় আর ১ জন যদি অসচেতন হয় তাহলেও পরিস্থিতির উত্তরণ হবে না। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।
সবুজ প্রকৃতি, নির্মল বায়ু ও দুষণমুক্ত পরিবেশে প্রকৃতি সাজবে আবার নতুনরূপে। লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, সরকারি নির্দেশনা প্রতিপালন, বৈশ্বিক শিথিলতার দৃষ্টান্ত অনুসরণ, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা, নিজ অবস্থান থেকে প্রত্যেককে দায়িত্বশীল আচরণ করা, সচেতন হওয়া ও মানবিকতার অর্জিত শিক্ষাগুলো অব্যাহত চর্চার মাধ্যমে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে । তবেই গড়ে উঠবে সমৃদ্ধির বাংলাদেশ।

মো. হাবিবুর রহমান- মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (উপসচিব)
habib.mopa@gmail.com

Check Also

কবিতার মহারাজ—আজাদুর রহমান

কবিতা আমার মহারাজ, আমি তার গোলাম। না জানা লোকের মত অজ্ঞাত কাগজ কলম নিয়ে থাকি, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 − 1 =