সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / করোনায় শিক্ষাক্ষেত্রে লাল-হলুদ-সবুজ জোন — মোঃ হাবিবুর রহমান

করোনায় শিক্ষাক্ষেত্রে লাল-হলুদ-সবুজ জোন — মোঃ হাবিবুর রহমান

 করোনায় শিক্ষা ক্ষেত্রে লাল-হলুদ-সবুজ জোন --- মোঃ হাবিবুর রহমান
Habibur Rahman

অসির চেয়ে মসি বড় অর্থ্যাৎ অস্ত্রের ঝনঝনানির চেয়ে বিদ্বানের কলম অধিক শক্তিশালী কথাটি সময়ের আবর্তে আবারো সম্মুখীন। অস্ত্র জীবন রক্ষা করে না, বরং ধ্বংস করে। করোনাযুদ্ধে অস্ত্রের বিন্দুমাত্রমূল্য নেই। এর বৈপরীত্যে জীবন বাঁচাতে বিজ্ঞানীরা করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারের নেশায় মত্ত। মরনঘাতি এ ভাইরাসে আমাদের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থা আজ পর্যদুস্থ। অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানবিক সেক্টরের পাশাপাশি শিক্ষা সেক্টরেও এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান। একটি আলো ঝলমল নতুন সূর্যের প্রতিক্ষায় দিন গুনছে গোটা বিশ্ব। শিক্ষা শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানের হাতিয়ার নয়, সমাজ বদলে দেওয়ার হাতিয়ার। একজন শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের হাতিয়ার হলো কলম আর সময়ের বিবর্তনে সেই সাথে সংযোগ হয়েছে ডিজিটাল ডিভাইস কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্ট ফোন ইত্যাদি। এগুলোই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মোক্ষম হাতিয়ার। একটি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের মাঝে সংযোগ স্থাপনকারী উপকরণ যা লাইফ স্টাইল বদলে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলকে বেকারত্ব ছুঁতে পারে না। যে পরিবারে একটি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ
আছে সে পরিবার নিঃসন্দেহে আধুনিক ও স্মার্ট পরিবার।

করোনার প্রভাবে ১৬ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আপাতত এ মেয়াদ ৬ আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত বজায় থাকলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বাড়তে পারে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেশনজট বা শিক্ষাজটের হাতছানি। সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ডিজিটাল পদ্ধতির অনালাইন কোর্স/ডিস্টেন্স লার্নিংএর উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপুমনি বলেছেন একটি বছর শিক্ষায় পিছিয়ে থাকলে আমাদের ছেলেমেয়েরা মূর্খ হবে না, কিন্ত করোনাকালে স্কুল খোলা রাখলে অনেক মায়ের কোল খালি হতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতি বিবেচনায় আরো ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে সবাইকে আহ্বান করেছেন।

২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক ও উন্নত দেশ গড়ার জন্য সকল খাতেই গুরুত্বপূর্ণ পদেক্ষেপ গ্রহণ করেন। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় এক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছে। কিন্তু করোনার সংক্রমণ রোধকল্পে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক সকলে সমানভাবে ডিজিটাল শিক্ষার সুফল ভোগ করতে পারছে না। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইস না থাকা, ইন্টারনেট সংযোগ না থাকা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি ও সদিচ্ছার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষায় অনলাইন কন্টেন্ট প্রস্তুত নেই। ফলে অনেকেই ঘরে বসে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত সুফল ভোগ করতে পারছে না। এসএসসি’র ফলাফল প্রকাশিত হলেও কলেজে ভর্তির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এইচএসসি ২০২০ যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় স্থবির হয়ে আছে। শিক্ষা ব্যবস্থায়লাল, হলুদ, সবুজ জোন তৈরী হয়েছে।

শিক্ষাদান পদ্ধতি জনপ্রিয় করতে পাঠ্য বইয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক ছবি, অ্যানিমেশন বা ভিডিওর কোনো বিকল্প নেই।
কিশোর বাতায়ন, শিক্ষক বাতায়ন, এটুআই, সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন, মুক্ত পাঠ-আকাশ আমার পাঠশালা, টেন মিনিটস স্কুল ইত্যাদি প্লাটফর্ম ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছে। এসব মাধ্যমের সাথে সংযুক্ত শিক্ষকগণ যথেষ্ঠ পরিশ্রম সাধন করছেন এবং সফলতা অর্জন করছেন যা আমাদের জন্য গর্বের।আবার ইন্টারনেট এর বদৌলতে জুম, ম্যাসেঞ্জার, ইউটিউব ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক শিক্ষকগণ ক্লাশ নিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে তাদের এ সকল কার্যক্রম প্রশংসার দাবীদার।

আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্ম হয়েছে প্রযুক্তির যুগে। নিঃসন্দেহে তারা আমাদের চেয়ে মেধাবী ও সৃজনশীল। আইটির বিষয়ে তাদের বোধগম্যতাও বেশি। শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের চাহিদার সাথে অনেক শিক্ষকগণ তাল মেলাতে পারছেন না। তৈরী হচ্ছে জেনারেশন গ্যাপ। কেননা পাঠদান পদ্ধতিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি বা আইসিটির সংযোগ নেই। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস তৈরীতে কিছুক্ষেত্রে ছাত্ররাই শিক্ষকদেরকে সহযোগিতা করেছে। ডিজিটাল ডিভাইসের কোন সমস্যা দেখা দিলে ছোটরা তাৎক্ষণিক সমাধান করছে এবং বড়দের কাজে সহযোগিতা করছে । আবার অনলাইন থেকে সেরা নির্বাচিত কন্টেন্ট সংগ্রহ করে শিক্ষকগণ ক্লাসে পাঠদান করছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পাঠ্য বই পড়ার চেয়ে ভিজ্যুয়াল পদ্ধতির পাঠদান মানব মস্তিষ্কে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় কেননা এক্ষেত্রে পঞ্চ ইন্দ্রিয়ঃ নাক, ত্বক, চোখ, কান ও হৃদয় একসাথে কাজ করে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরাও বেশ আনন্দ উপভোগ করে। যে শিক্ষক ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদান করেন তার জনপ্রিয়তাও শীর্ষে থাকে।

করোনা সংকটকালে চক, বোর্ড, ডাস্টার ও ক্লাসরুম নির্ভর পাঠদান কৌশল কাজে আসছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে প্রতিটি শিক্ষার্থীর ঘরই আজ পাঠশালায় পরিণত হয়েছে।অধিকাংশ সময় ঘরে থাকায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও শিক্ষার্থীদের পাঠ সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করছেন। এমনকি অনেক কোচিং সেন্টারও অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে। এ সকল সুবিধা শহরকেন্দ্রিক, উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝেই সীমাবদ্ধ যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষার্থীর তুলনায় অতি নগন্য। শিক্ষাবর্ষের সাথে তাল মিলিয়ে যারা পাঠ সম্পন্ন করে যাচ্ছে তারাই তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে অর্থ্যাৎ সবুজ জোনে আছে।

করোনার কারণে দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে । সরকার এ পরিস্থিতি উত্তরণে টেলিভিশন, রেডিও, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সবাই গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে না। যদিও ডিজিটাল ক্লাস উপযোগী দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে।ডিজিটাল জীবনধারা অনুসারে মোবাইল ফোনের ব্যাপক প্রসারের পরও স্মার্ট ফোনের হার শতকরা ৩০ ভাগ অতিক্রম করেনি। ফলে অনেকেই স্মার্ট ফোনের সুবিধা না থাকলেও নিজ তাগিদে বাসায় থেকে নিজ নিজ ছেলে মেয়েদের পড়ালেখার প্রতি যত্নবান হচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও পাঠ্য বইয়ের প্রতি মনোযোগ দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম মোটামুটি চালিয়ে নিচ্ছে। এ পর্যায়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যাও খুব একটা বেশি নয়। এরা রয়েছে হলুদ জোনে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দীর্ঘ ছুটির জের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছয় মাস থেকে প্রায় এক বছর পর্যন্ত সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনলাইন ক্লাসের বিষয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। ব্যানবেইস ও ইউজিসির তথ্য মতে, বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত ৪টিসহ ৪৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আট লাখ শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষা পুরোপুরি বন্ধ আছে। তাদের শিক্ষাজীবনে একযোগে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। টিউশনি ও কোচিং বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষার খরচ মেটাতে না পেরে শহর ছাড়ছে। এছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়ালেখা না করায় ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ঘরে বসেও অনেকেই লেখাপড়া না করে অযথা দিন পার করছে।ফলে শিক্ষার সাথে তাদের দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। এ সকল শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বাধিক যারা সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে অর্থ্যাৎ রেড জোনে আছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরের জন্য বৃত্তিমূলক এবং কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছিলেন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সামনে রেখে উন্নত প্রযুক্তি ও উপযুক্ত দক্ষতাগুলোকে চিহ্নিত করে নিয়মিত পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ফলে সাধারণ শিক্ষার সাথে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে এবং বেকারত্ব দূর হবে।

হাতের মুঠোয় এখন গোটাবিশ্ব। জীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত,অর্থবহ ও সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য শিক্ষাই মুখ্য হাতিয়ার। জাতির এ ক্লান্তিলগ্নে যেসকল শিক্ষক এসব প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে, তাদেরকে আরো দায়িত্বশীল হয়ে শিক্ষাযোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান বিতরণ, দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন ও মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। সকল শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে কাজ করতে হবে। সংক্ষিপ্ত পরিসরে শিক্ষাবর্ষ সমাপ্ত করা, বন্ধ থাকা পাবলিক পরীক্ষাগুলো গ্রহণ করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি কৌশল ঠিক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাজট বা সেশনজটের কবল থেকে জাতিকে রক্ষার্থে ও ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিক্ষা সংস্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকগণকেও আন্তরিকতা, মহত্ব ও আদর্শের পরিচয় দিতে হবে। ক্রান্তিকালীন সময়ে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখতে হবে। তবেই জাতি সামগ্রিকভাবে উপকৃত হবে। সময়ের আবর্তে যোগ্য আর দক্ষরাই টিকে থাকবে আর অদক্ষরা ঝরে পড়বে।

লেখকঃ মোঃ হাবিবুর রহমান
উপসচিব
habib.mopa@gmail.com

Check Also

সমাজে তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার ও একজন মিনাকা—অ্যাড. মোঃ আব্দুল মালেক

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করা মানুষের স্বভাব। কেউ সমাজের বাহিরে নয়। পরিবার সমাজের একক। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + 14 =