সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / টিকা-মাস্ক-সামাজিক দুরত্ব, জনগণের অভিব্যক্তি ও বাস্তবতা

টিকা-মাস্ক-সামাজিক দুরত্ব, জনগণের অভিব্যক্তি ও বাস্তবতা

বিপর্যস্ত পৃথিবী। প্রতিদিন বাড়ছে সংক্রমণ, দীর্ঘায়িত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। করোনা ভাইরাস ডিজিজ বা কোভিড তার শক্তি ও গতিপথ ক্রমশই পরিবর্তন করে, শক্তিশালী হয়ে আঘাত হানছে মনুষ্য জাতির উপর। সে আঘাতে আজ প্রায় বিপন্ন মানব সভ্যতা। বিশ্বের মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর কপালেও আজ চিন্তার ভাজ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে অবিশ্বাস্যরকম স্বল্পতম সময়ে উদ্ভাবিত হয়েছে টিকা। প্রতিনিয়ত চলছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা। চেষ্টা চলছে আরও উন্নততর টিকা ও ওষুধ উদ্ভাবনের। বিশ্বের ৭ শ’ আটাত্তর কোটির উপর জনসংখ্যার মাত্র সীমিত সংখ্যক এ পর্যন্ত এ টিকার সুবিধা পেয়েছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এক্ষেত্রে অনেকটা এগিয়ে থাকলেও বঞ্চিতের পর্যায়ে রয়েছে অনুন্নত দেশগুলো।
তারপরেও চলছে টিকা উৎপাদন, টিকা প্রাপ্তি ও টিকাদানের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। হয়তো একদিন সে চেষ্টায় সফলও হবে মানবজাতি। কিন্তু ততদিনে বড় ধরণের মূল্য দিতে হতে পারে তাদের।
তবে কী কোনই উপায় নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মমতো মাস্ক পরিধান, ঘন ঘন সাবানপানি দিয়ে হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্ন থাকা ও সামাজিক দুরত্ব এড়িয়ে চললেী এ ভাইরাসকে প্রতিহত করা সম্ভব।
বিপত্তি সেখানেই। ২০২০ সালে বাংলাদেশে এ ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব হলে সরকার ও সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ভাইরাসকে অবদমিত করার বিজ্ঞানভিত্তিক কথাগুলো ব্যাপকভাবে জনসম্মুখে উপস্থাপন করলেও অনেকটা শুনেও না শোনার ভান করেছে সাধারণ জনগণ। সেনাবাহিনী, পুলিশ-বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনী নামিয়ে জোর করে তাদের পরিধান করাতে হয়েছে মাস্ক। ছুটিতে বিশেষ করে ঈদের ছুটিতে সামাজিক দুরত্বের নূন্যতম বালাই না মেনে গ্রামে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম আমরা সকলে। ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সালের আজকের দিন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সবচেয়ে বেশি বিয়েশাদির ঘটনা ঘটেছে। যেন করোনাকাল বিয়েশাদির জন্য মোক্ষম সময়। এ সময় হয়েছে জনসমাগমে পূর্ণ সকল রাজনৈতিক সমাবেশ, নির্বাচনী গণসংযোগ ও নির্বাচন। পরিস্থিতি প্রতিকুলে গেলেই সরকার বাধ্য হয়ে দিয়েছে লকডাউনের মতো কর্মসূচি।
বাংলাদেশে করোনার প্রথম বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে যখন দেশের বরেণ্য ব্যক্তিরাসহ সাধারণ মানুষ মৃত্যুর কাছে পরাস্ত হচ্ছিলো তখন গ্রামগঞ্জে রোল ওঠে- করোনা শহরের অসুখ ও ধনীদের অসুখ। গ্রামের মানুষের করোনা হয়না এবং হবেনা। এসব খামখেয়ালিপনার কারণে এবছর সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। জানা গেছে, এবছর বাংলাদেশের গ্রামগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত। এই মুহূর্তের বাস্তব চিত্র- বাংলাদেশের গ্রামে ও শহরের অধিকাংশ বাড়িতে মানুষ জ্বর অথবা কাশিতে আক্রান্ত। এদের মধ্যে মাত্র সীমিত সংখ্যক মানুষ এ জ্বর বা কাশিকে আমলে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছে। বাকীরা রয়েছে সেই তিমিরেই। প্রাচীন পদ্ধতিতে চলছে তাদের চিকিৎসা। আইসোলেশন বা হোম কোয়ারেন্টাইনের মতো কোন বিষয়ের মধ্যেই তারা নেই। অসুস্থ অবস্থাতে তারা ঘুরেও বেড়াচ্ছেন নিজের খেয়াল-খুশিমতো। আর এতে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে সামাজিক সংক্রমণ। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই করোনায় প্রতিদিনের মৃত্যু ২ শ’ অতিক্রম করেছে। এটি শুধু যারা করোনা পরীক্ষা করিয়ে পজেটিভ হয়েছেন তাদের মধ্যকার হিসাব। বাস্তবে এ অংক আরও অনেক বেশি । কারণ এখনও বিস্তৃত জনগোষ্ঠী করোনা পরীক্ষার আওতায় আসেনি। প্রতিদিন যেভাবে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়ছে তা আশঙ্কাজনক।
জনগনকে বাঁচাতে দেশে আবারও শুরু হয়েছে লকডাউন। ঢিলেঢালা কয়েকদফা লকডাউন হওয়ার পর এখন চলছে কঠোর লকডাউন। কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। প্রশাসনকে সহায়তা করতে প্রাণান্ত চেষ্টা করছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও সরকার মানুষকে বাঁচাতেই বাধ্য হয়ে কঠেরতা অবলম্বন করেছে। ঘরে থাকা মানুষগুলোর জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে না পারলেও সরকার সহায়তা দিতে সবধরণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। লকডাউনে জনগনকে আইন মানাতে ও ঘরে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে প্রশাসন। দিনরাত এ কাজটি তদারকি করতে প্রশাসনের ভ্রাম্যমান টিম ঘুরে বেড়াচ্ছেন এ শহর থেকে ও শহরে, এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে। তাদের দেখে ভো দৌড় দিচ্ছে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করা জনগণ। প্রশাসনের লোকজন সরে গেলেই আবার জটলা করছেন মোড়ে মোড়ে। আর সুযোগ বুঝে দোকানের ঝাপ খুলছেন চায়ের দোকানদার বা অন্য ব্যবসায়ীরা।
এ লুকোচুরিতে প্রকারন্তরে আমরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করছি। এখনো যদি এধরণের লুকোচুরি বন্ধ করতে না পারি তাহলে আরও বড় ধরণের মূল্য দিতে হবে আমাদের।

 

সম্পাদক-বাঙালি বার্তা

Check Also

দুর্নীতির ইতিহাস ও শুয়োরের বাচ্চাদের গপ্পো—আরজ আলী মাতুব্বর

দীর্ঘদিন ধরে এই দেশের প্রশাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় দুই হাজার বছর আগে মনুস্মৃতি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 2 =