সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / জাতীয় / টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে মহানায়ক বঙ্গবন্ধু

টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে মহানায়ক বঙ্গবন্ধু

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে এক শিশুর জন্ম হলো। নাম খোকা। গ্রামের মানুষ ছাড়া কেউ তার জন্মের কথা জানেনি।

এর পঞ্চান্ন বছর পর যখন সেই খোকার মৃত্যু হলো, স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, ঘাতকদলের হাতে মর্মান্তিক মৃত্যু, তখন সারা বিশ্ব শোকে আচ্ছন্ন হয়েছে। তিনি তখন টুঙ্গিপাড়ার খোকা নন, সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত একটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু।

তার মৃত্যুতে ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন লন্ডনে বসবাসকারী এক বাংলাদেশি নেতার কাছে লেখা চিঠিতে বলেছেন, ‘It is a great national tragedy for you, but a personal tragedy for me.’ (এটা তোমাদের জন্য এক বিরাট জাতীয় ট্র্যাজেডি; কিন্তু আমার কাছে একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি)। ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডস-এর এক মানবতাবাদী সদস্য বলেছেন, ‘পৃথিবীর বহু নেতা তার দেশকে স্বাধীন করেছেন; কিন্তু শেখ মুজিব তার দেশকে দুবার স্বাধীন করেছেন।’

বিশ শতকের সত্তরের দশকের বিশ্বনেতাদের কাছে টুঙ্গিপাড়ার সেই খোকা হয়ে উঠেছিলেন এক অপরাজেয় বীর। ফিদেল ক্যাস্ত্রো তার সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখেছি।’

লন্ডনের সানডে অবজারভারে তাকে বলা হয়েছে ‘পোয়েট অব পলিটিকস’-রাজনীতির কবি। এ কবির ডাকে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতালাভের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মধ্যযুগীয় একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে এসেছিল স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। যার চারটি রাষ্ট্রীয় ভিত্তি-গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।

এক মার্কিন সাংবাদিক বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘আমার কাছে বিস্ময় লাগে, উপমহাদেশটির রাজনীতির ভিত্তিই যেখানে ধর্ম, গান্ধী ও জিন্নার মতো পাশ্চাত্য শিক্ষিত নেতারাও যেখানে ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব এড়াতে না পেরে তার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, দেশটাকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করেছেন, সেখানে দেশ দুটিতে ধর্মীয় জাতীয়তার উন্মাদনা শেষ না-হতেই নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের এক যুবক কী করে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তার ডাক দিয়ে তার দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করলেন এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটালেন। সাবেক মুসলিম লীগপন্থিদের প্রতিষ্ঠান বিএনপি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল আরব শেখদের অর্থে পরিচালিত জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশে একটি গৃহযুদ্ধ বাধাতে সক্ষম বলে অনেকে ভেবেছিলেন। কিন্তু বাঙালি মুসলমানরা তাদের ডাকে সাড়া দেননি। ফলে বিএনপি ও জামায়াতকে গোপন ষড়যন্ত্র ও গোপন হত্যাকাণ্ডের পথে যেতে হয়েছে। তাতে তারা সাময়িক সাফল্য পেয়েছে; কিন্তু স্থায়ী কোনো সাফল্য পায়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা এখন পরাজিত শক্তি। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র এখনো একটি নাম সাড়া জাগায়-শেখ সাহেব।’

মার্কিন সাংবাদিকের এ পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত সঠিক। টুঙ্গিপাড়ার খোকা পরে হলেন বাংলাদেশের শেখ সাহেব। তারপর বিশ্বনেতা। এক পর্যায়ে হলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু। জুলিও কুরি বিশ্ব শান্তিপদক লাভের সময় টুঙ্গিপাড়ার খোকাকে সম্বোধন করা হলো বিশ্ববন্ধু হিসাবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফজলুল হক পরিচিত হয়েছিলেন ‘হক সাহেব’ নামে। হক সাহেব বলা হলে একমাত্র ফজলুল হককে বোঝানো হতো। তেমনি পরবর্তীকালে একটি নাম সারা বাংলায় পরিচিত ও প্রচারিত হয়েছিল, সেটি শেখ সাহেব। শেখ সাহেব বললে আর কোনো শেখকে নয়, একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানকেই লোকে চেনে।

তার জীবনকাল মাত্র পঞ্চান্ন বছর। এ পঞ্চান্ন বছরে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সুপ্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। অবলুপ্ত বাংলাদেশ ও বাঙালি এ দুটি নামের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন। বাঙালি নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাঙালি জাতির অস্তিত্ব উদ্ধার করেছেন।

কবে কোন পালরাজাদের আমলে বাংলাদেশ স্বাধীন ছিল, তারপর হাজার বছর ধরে বাঙালি দাস জাতি পরাধীন। কখনো দিল্লির ব্রাহ্মশক্তি, কখনো তুর্কি, পাঠান, মোগল, ইংরেজরা; শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকরা দেশটাকে তাদের শোষণ ও শাসনের লীলাভূমি করে রেখেছিল। বাংলাদেশের জাতীয় নেতৃত্ব এদিকে বহুদিন দৃষ্টি দেননি। তারা তুরস্কের মধ্যযুগীয় খেলাফত উদ্ধার, অসহযোগ দ্বারা ইংরেজ রাজত্ব উচ্ছেদ ইত্যাদি স্বপ্নে বিভোর ছিলেন।

লক্ষ করার বিষয়, শেখ মুজিবুর রহমান যে বছর (১৯২০) জন্মগ্রহণ করেন, তার আগের বছর (১৯১৯) প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়। কথা ছিল যুদ্ধ শেষে ইংরেজরা ভারতবাসীকে স্বায়ত্তশাসনাধিকার দেবে।

Check Also

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় সব নির্বাচন স্থগিত

বাঙালি বার্তা ডেস্কঃ বৃহস্পতিবার (১ এপ্রিল) নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় প্রথম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − eight =