সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / ঠগী কাহিনী, রিজেন্ট হাসপাতাল ও সরকারের ভাবমূর্তি

ঠগী কাহিনী, রিজেন্ট হাসপাতাল ও সরকারের ভাবমূর্তি

ঠগী কাহিনী, রিজেন্ট হাসপাতাল ও সরকারের ভাবমূর্তি
বাঙালি বার্তা

১৩ থেকে ১৯ শতকে বাংলাসহ উত্তর ভারতে ত্রাসের রাজত্বে মেতে উঠেছিলো বিশেষ একটি সম্প্রদায়। ধোকাবাজ বা প্রতারকদের এই দলের লোকজন ঠগ এবং দলটি ঠগীদল নামেই সমাধিক পরিচিত। প্রতারণার মাধ্যমে নিপুণ, নিষ্ঠুর এই খুনীর দল অসংখ্য মানুষ হত্যা করেছে। তারা যত মানুষ হত্যা করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। এরা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতো, পথে যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতো। তারপর সময় সুযোগ বুঝে যাত্রীদের মেরে ফেলে সবকিছু লুট করতো।
দল বেঁধে চলত ঠগীরা । ঠগীদের লোকজন গোপনে বাজার কিংবা সরাইখানা থেকে পথযাত্রীদের সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য যোগাড় করত। অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের সংগে সখ্যতা করতো। পথযাত্রীদের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে তাদের জন্য খাবারসহ অন্যান্য সেবার ব্যবস্থা করত। সহযাত্রীদের আতিথেয়তায় খাবার খেয়ে পথ চলতি ক্লান্ত যাত্রীরা বিশ্রামে গেলেই শুরু হতো ঠগীদের আসল কাজ। সর্দারের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ঠগীরা নেমে পড়তো নির্মম হত্যাযজ্ঞে। একজন যাত্রীকে খুন করত তিনজনের একটি দল। একজন মাথা ধরে রাখত, অন্যজন ফাঁস পরাত, আরেকজন পা চেপে ফেলে দিত। কেউ পালিয়ে গেলেও রক্ষা নেই, কাছাকাছি ওত পেতে থাকা ঠগীদের আরেকটি দল তাদের ধরে ফেলতো।
ঠগীরা ব্যবহার করতো সাঙ্কেতিক ভাষা। যেমন- ‘ঝিরনী’ শব্দে হত্যার প্রস্তুতি, ‘তামাকু লাও’ শব্দের মাধ্যমে হত্যা এবং ‘বাসন মেজে আনার কথা’ বলার মধ্য দিয়ে কবর তৈরির নির্দেশ প্রদান করা হতো । নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নিমিষেই ফাঁস জড়ানো হতো শিকারের গলায়। হত্যা করে লুট করা হতো পথযাত্রীদের যাবতীয় সামগ্রী।
ফিরোজ শাহর ইতিহাস গ্রন্থ হতে জানা যায়, ১২৯০ এর সুলতানী শাসনের সময় প্রায় হাজার খানেক ঠগ ধরা পরে। অজানা কারণে সুলতান তাদের কোনো রকম সাজা না দিয়ে দিল্লীতে ফিরে না আসার শর্তে, অনেকটা আপ্যায়নের সাথে নৌকায় তুলে দিয়ে ভাটির দেশে- তথা বাংলায় পাঠিয়ে দেন। আর তারপর থেকেই বাংলার জলে-স্থলে, মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে পরে এই খুনির দলের সাবলিল বিচরণ।
সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি আলোচিত নাম ‘রিজেন্ট হাসপাতাল।’ এ হাসপাতালে ও রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে বসে কোভিড-১৯ পরীক্ষার ভূয়া রিপোর্ট তৈরি করে অসহায় রোগীদের সেই রিপোর্ট দিয়ে আসছিলো তারা। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর অনুমোদন দিয়েছিলো ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। যদিও এসব হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ একবার উত্তীর্ণ হওয়ার পর আর নবায়ন করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে ২০১৭ সালে মিরপুরেও হাসপাতালটির আরেকটি শাখা খুলে তার অনুমোদন নেয়া হয়।
হাজার হাজার স্যাম্পল টেস্ট না করেই তারা ভূয়া রিপোর্ট দিয়েছে। হাসপাতালটিতে সংরক্ষিত ছিল অনুমোদনহীন র‌্যাপিড কিট ।
জানা গেছে এ হাসপাতালের আইসিইউ একটা সাধারণ ওয়ার্ডের চেয়েও নিম্নমানের। যেখানে পুরনো কাথা বালিশ থেকে আরম্ভ করে সব আছে। হাসপাতালটির ডায়াগনোসিস ল্যাবে কোনো মেশিন নেই। হাসপাতালের ফ্রিজের মধ্যে পাওয়া গেছে মাছ। এর ডিসপেনসারির সব সার্জিক্যাল আইটেম ৫/৬ বছর আগের মেয়াদোত্তীর্ণ। কোন পরীক্ষা না করেই ভূয়া রিপোর্ট দিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রিপোর্ট বিশ্বাসযোগ্য করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সিল ও প্যাড নকল করে ব্যবহার করা হতো। র‌্যাবের অভিযানে এসব তথ্য জানা গেছে। রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানিয়েছেন “এসব অনিয়মের সাথে হাসপাতালটির চেয়ারম্যানই জড়িত এবং তিনি নিজেই এসব ডিল করেছেন। ” ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মূল হোতাকে গ্রেফতার করতে না পারলেও ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।
গত ৮ই মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের পর যখন কোনো হাসপাতাল করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে রাজী হচ্ছিলোনা তখন উদারতা দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার গোপন অভিলাষে এগিয়ে এসেছিল রিজেন্ট হাসপাতাল। সেসময় রিজেন্টসহ তিনটি হাসপাতালের সাথে চুক্তি করে স্বাস্থ্য বিভাগ। চুক্তির আওতায় সরকার সেখানে ডাক্তার, নার্সসহ জনবল নিয়োগ দেয়। কথা ছিল হাসপাতালটি করোনা রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা চিকিৎসাসেবা দেবে, পরে সরকার সেই টাকা পরিশোধ করবে। কিন্তু তা না করে জাতির ক্রান্তিকালে চরম লুটপাটে মেতে ওঠে রিজেন্ট হাসপাতাল। সরকারিভাবে যে টেস্ট বিনামূল্যে করার কথা সেগুলোর জন্য তারা টাকা আদায় করতো। আবার রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করে পরে সেটিকে বিনামূল্যে করা হয়েছে দেখিয়ে সরকারের কাছে প্রায় দেড় কোটি টাকার বিল জমা দিয়েছিলো রিজেন্ট কর্তৃপক্ষ। এমনকি যেই চিকিৎসা বিনামূল্যে করার কথা সেটির জন্য রোগীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আবার সরকারের কাছ থেকেও সেই টাকা গ্রহণ করেছে হাসপাতালটি। হাসপাতালটি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর কোনো পরীক্ষা ছাড়াাই পজিটিভ বা নেগেটিভ উল্লেখ করে রিপোর্ট দিতো। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিত করেছে যে এসব নমুনা তারা পরীক্ষা করেনি এবং এসব রিপোর্টও তারা দেয়নি।
সুস্থতার ভূয়া রিপোর্ট নিয়ে অনেকে নিজেকে সুস্থ মনে করে দিব্যি ঘুড়ে বেরিয়েছেন, সংক্রমিত করেছেন পরিবারের লোকজনসহ অন্যান্য মানুষদের।
জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অগ্রগতির সকল সূচকে আজ এগিয়ে প্রিয় বাংলাদেশ। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল স্থাপন প্রকল্প, উড়াল সেতু, চার লেন-ছয় লেনের মহাসড়ক স্থাপনের মতো কাজগুলো এ সরকারকে দিয়েছে অনন্য উচ্চতা। কাক্সিক্ষত রেমিট্যান্স আহরণ, জিডিপির অগ্রগতি,কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি, সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিগুলো এদেশকে ক্রমশই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাতির জনকের হত্যাকারীদের, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা, সমুদ্রসীমা জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখ-ের বিস্তৃতি সরকারকে এনে দিয়েছে অসামান্য সাফল্য।
বৈশ্বিক বিপর্যয় করোনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মেধাদীপ্ত নেতৃত্বে সরকারের গৃহীত কর্মকান্ডগুলোও ব্যাপক প্রশংসার দাবীদার। গৃহীত পদক্ষেপে উজ্জ্বল হয়েছে সরকারের ভাবমূর্তি।
কিছু দুর্নীতিবাজ অসৎ কর্মকর্তার দুর্নীতি, অসৎ কিছু জনপ্রতিনিধির গরীব মানুষের বরাদ্দ চাল আত্মসাৎ, রিজেণ্ট হাসপাতালের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের চরম অসততা, স্বেচ্ছাচারিতা, সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে ঠগের ভূমিকা সরকারের সে উজ্জ্বলতাকে করেছে ম্লান, ভাবমূর্তিকে করেছে ক্ষতিগ্রস্ত।
এখনই শক্ত হাতে এসব অপশক্তিকে দমন করতে না পারলে সংকট ঘনিভূত হবে, বাঁধাগ্রস্ত হবে উন্নয়ন, ভুলণ্ঠিত হবে সরকারের সকল অর্জন।

(ইকবাল কবির লেমন-সম্পাদক, বাঙালি বার্তা, আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মী।
মোবাইল ফোনঃ ০১৮২৭-৫৮৭১৭৮)

Check Also

ফাগুন যায় ফাগুন আসে, কিংবদন্তি জহির রায়হান আসে না

ফাগুন যায় ফাগুন আসে, কিংবদন্তি জহির রায়হান আসে না

ফাগুন যায় ফাগুন আসে কিন্তু আমাদের প্রিয় জহির রায়হান আর আসে না। জহির রায়হান; একটি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − 11 =