সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / দুর্নীতির ইতিহাস ও শুয়োরের বাচ্চাদের গপ্পো—আরজ আলী মাতুব্বর

দুর্নীতির ইতিহাস ও শুয়োরের বাচ্চাদের গপ্পো—আরজ আলী মাতুব্বর

দীর্ঘদিন ধরে এই দেশের প্রশাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। প্রায় দুই হাজার বছর আগে মনুস্মৃতি সংকলিত হয়। এর ১২৩ ও ১২৪ অনুচ্ছেদের ব্যাখা নিম্নরুপঃ
প্রজাদের রক্ষার দায়িত্ব রক্ষার জন্য যাদের নিয়োগ করা হয়েছে তারাই ভণ্ডামি করে অন্যের জমি গ্রাস করে। এবং রাজাকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে হবে। রাজার দায়িত্ব হলো যে সব দুষ্ট লোক বিভিন্ন পদ থেকে জনগণের কাছে থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তাদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।
আজ থেকে দুই হাজার বছর আগের এই পরামর্শ আমাদের সরকার বা রাষ্ট্র এখনও গ্রহণ করতে পারেনি।
চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের বয়সও প্রায় দুই হাজার বছরের। চাণক্য লিখেছেন-
সরকারি কর্মচারীরা দুইভাবে বড়লোক হয় হয় তারা প্রজাদের উপর অত্যাচার করে অথবা সরকারকে প্রতারণা করে। চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে সরকারি কর্মচারীদের ৪০ ধরনের এইরুপ তছরুপ বা দুর্নীতির কথা বলা হয়েছে। চাণক্য আরও লিখেছেন-
জিহবার ডগায় মধু অথবা বিষ থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব তেমনি অসম্ভব হলো সরকারের তহবিল নিয়ে লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পত্তি চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করবে তা নির্ণয় করা যেমন অসম্ভব ঠিক তেমনি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্মচারীরা কখন সরকারের সম্পত্তি তছরুপ করবে সেটা নির্ণয় করাও সম্ভব নয়।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও দুর্নীতির জীবন্ত বর্ণনা রয়েছে। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম লিখেছেন-
সরকার হইলো কাল -খিল ভূমি লিখে লাল।
বিনা উপকারে খায় ধুতি।
সরল ভাষায় এর অর্থ নিম্নরূপঃ
রাজস্ব কর্মকর্তা অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছে। অনাবাদি জমিকে ফসলী জমি গণ্য করেছে যার ফলে অতিরিক্ত খাজনা দিতে হচ্ছে। মুকুন্দরামের লেখা পড়ে মনে হচ্ছে ঘুস দিয়ে তার দুঃখ নেই, কিন্তু দুঃখ হলো ধুতি ঘুস দিয়েও কাজ হচ্ছে না।
ঘুস নিয়ে কাজ করলে যে অর্থনৈতিক লেনদেন হয় তাতে কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয় অনেক অর্থনীতিবিদদের মতে। কিন্তু ঘুস নিয়েও কাজ না করলে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় অনেক অর্থনীতিবিদ তাই একে বলেন শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি। সেকারণেই হয়তো মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম বলেছিলেন শুয়োরের বাচ্চারা জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
বাংলা লোকসাহিত্যেও এই ধরনের দুর্নীতির উল্লেখ রয়েছে। মলুয়া লোকগীতিতে স্থানীয় কাজী সম্পর্কে নিম্নরূপ বর্ণনা দেখা যায় –
‘বড়ই দূরন্ত কাজী ক্ষমতা অপার
চোরে আশ্রয় দিয়া সাউদেরে দেয় কার,
ভালো মন্দ নাহি জানে বিচার আচার
কুলের বধু বাহির করে অতি দুরাচার।’
অর্থাৎ বড়ই দূরন্ত কাজীর অপার ক্ষমতা রয়েছে সে চোরকে আশ্রয় দেয় আর সাধুকে দেয় কারাবাস। ভালো মন্দ বা আচার বিচার জানে না সে এতই খারাপ যে কুলের বধুদের ঘর থেকে বের করে আনে।
তাত্ত্বিক দিক থেকে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন দুর্নীতি উন্নয়নের পথে সহায়ক।জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক অচলায়তন দুর্নীতির মাধ্যমে এড়ানো সম্ভব। ঘুসের মহাত্ত্বে লালফিতার দৌড়াত্বকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া সম্ভব।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শক হ্যান্টিংটন তাই পরামর্শ দেন “অতি কেন্দ্রীভূত সৎ আমলাতন্ত্রের চেয়ে অতি কেন্দ্রীভূত ঘুসখোর আমলাতন্ত্র শ্রেয়। অবশ্য এই ধরনের যুক্তির দূর্বলতা রয়েছে। দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য একবার ঘুস দেওয়া শুরু হলে ঘুস ছাড়া কোন সিদ্ধান্তই পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক অর্থনীতিবিদদের মতে ঘুস হলো একধরনের অলিখিত চুক্তি আদালতের মাধ্যমে এই চুক্তি কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিশ্বাস ভঙের সম্ভাবনা এখানে অনেক বেশী। তাই দুর্নীতিকে তারা দুইভাগে ভাগ করেছেন যথা নির্ভরযোগ্য দুর্নীতি, অনির্ভরযোগ্য দুর্নীতি। বিশ্বাসযোগ্য দুর্নীতিতে অনেক মানুষই আগ্রহী তারা এটাকে পছন্দ করেন। অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্যারেটের মতে রাষ্ট্রের আইন এবং অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো অনির্ভরযোগ্য দুর্নীতি। আপনি যে উদ্দেশ্যে টাকা দিলেন সে উদ্দেশ্য সফল হলো না। এই ধরনের অর্থনীতিকে তাই তিনি বলেছেন শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের মালেক নির্ভরযোগ্য দুর্নীতির সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। সে টাকা নিয়েছে, কাজ করে দিয়েছে তা না হলে ১০০ কোটি টাকা অর্জন করতে সে পারতো না।
আবার জিকে শামীম, পাপিয়া, ঘোড়াঘাটের ইউ এন ও থেকে শুরু করে হাজারো আমলা রাজনীতিবিদ আছেন যারা অনির্ভরযোগ্য দুর্নীতির সাথে জড়িত। এরা চাকরি দেয়ার কথা বলে মানুষের টাকা মেরে দেয় জমি দখল করে এদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে আমরা বলতে পারি শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি ।
এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ এখন দুর্নীতি আর শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি দ্বারা পরিচালিত।
(তথ্যসূত্র পরার্থপরতার অর্থনীতি -ড.আকবর আলী খান)

(আরজ আলী মাতুব্বর- শিক্ষক ও লেখক)

Check Also

ফাগুন যায় ফাগুন আসে, কিংবদন্তি জহির রায়হান আসে না

ফাগুন যায় ফাগুন আসে, কিংবদন্তি জহির রায়হান আসে না

ফাগুন যায় ফাগুন আসে কিন্তু আমাদের প্রিয় জহির রায়হান আর আসে না। জহির রায়হান; একটি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 − two =