সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / দেশ রাঙাচ্ছে বগুড়ার লাল মরিচ

দেশ রাঙাচ্ছে বগুড়ার লাল মরিচ

এমএম মেহেরুল, সংস্কৃতি প্রতিবেদক, বাঙালি বার্তাঃ বগুড়ার লাল মরিচের সুখ্যাতি দেশজুড়ে।দেশ ছাপিয়ে দেশের বাইরেও জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁইছুঁই। ভিন্ন স্বাদ ও ঝাঁঝের কারণে বগুড়ার মরিচের চাহিদা ঝালপ্রিয়দের কাছে সবার আগে। বিশেষ করে নারীদের পছন্দের শীর্ষে বগুড়ার লাল মরিচের ঝাল। রঙ আর স্বাদের গুনাগুণের নিরিখে রান্নার রসনা হিসেবে এই মরিচের গুড়ো গৃহিণীর নখদর্পনে থাকতেই হবে।

দেশের “খাদ্যরাজধানী” হিসেবে খ্যাত বগুড়ায় ধান, গম, ভুট্টার পাশাপাশি প্রায় সব রকমের সবজি চাষ হয়। এসব উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হয় দেশের প্রায় সব অঞ্চলে। অনেক কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে দেশের বাইরেও। জেলার মোট ১২ উপজেলার প্রায় সব কটিতে কমবেশি মরিচের চাষ হয়।বিশেষ করে সোনাতলা -সারিয়াকান্দী অঞ্চলে যমুনার পলিমাটির কারনে মরিচের চাষ কিছুটা বেশিই হয়ে থাকে। লাল মরিচের চোখ ঝলসানো দৃশ্য এখন বগুড়ার চরাঞ্চলের মাঠে মাঠে শোভা পাচ্ছে। স্থানীয় কয়েক হাজার কৃষক লাল স্বপ্নে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছেন। মাঠের মরিচ এখন কৃষকের গোলায় উঠতে শুরু করেছে। মাইলের পর মাইল যমুনার পাকা বাঁধে শুকানো হচ্ছে এসব মরিচ। কৃষকের এই লাল স্বপ্নের সঙ্গে মিশে আছে জেলার প্রায় ১০ হাজার নারী শ্রমিক। তাদের চোখে-মুখেও সুখআনন্দের আভা।কৃষিসম্প্রসারণঅধিদপ্তরের তথ্যমতেএ মৌসুমে বগুড়া কৃষি অঞ্চলে মরিচের চাষ হয়েছেপ্রায় ১০ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমিতে। এ বছর মরিচ উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন, যার বাজার মূল্য প্রায় সোয়া ৩০০ কোটি টাকা। স্থানীয় বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেমন সেই মরিচ সরবরাহ হচ্ছে, তেমনি তা বিদেশের বাজারও দখল করছে এখন।

মরিচের চাষ সবচেয়ে বেশি হয় যমুনা বিধৌত সারিয়াকান্দি উপজেলার চরাঞ্চলে। বরাবরই মরিচ চাষের জন্য বিখ্যাত এই চর এলাকা। প্রতি বছরের মতো এ বছরও যমুনার চরে বাম্পার ফলন হয়েছে মরিচের। বন্যায় প্রচুর পরিমাণ পলিমাটি জমিতে পড়ার ফলে নদী তীরবর্তী এলাকাতে মরিচের চাষ তুলনামূলক একটু বেশিই ভালো হয়। এবার শুধু সারিয়াকান্দি উপজেলায় চাষ হয়েছে ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে।

লাল টুকটুকে পাকা মরিচ জমি থেকে তুলে ১৫ দিন রোদে শুকানোর পর বাজারজাত করার উপযোগীহয়েওঠে। আর এই শুকনা মরিচের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।বর্তমানে প্রতি মণ শুকনা মরিচ প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর তীর বা স্থানীয় চাতাল গুলোতে গেলে এখন টের পাওয়া যায় মরিচের ঝাল। যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ কাজের জন্য যে ঢালগুলো রয়েছে, সেসব স্থান এখন মরিচ চাষী ও ব্যবসায়ীদের দখলে। একই অবস্থা কৃষকের ঘরের টিনের চাল ও চাতালগুলোরও। চর থেকে মরিচ তুলে এনে সেসব মরিচ শুকানো ও পরিচর্যার (বাছাই) কাজ করা হচ্ছে সেখানে।এসব মরিচ বাড়ি থেকেই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন পাইকাররা। দামও পাচ্ছেন বেশ ভালো। আগের মতো বাজারে ছুটতে হচ্ছে না কৃষকদের। অনেক সময় পাইকাররা ছুটে আসছেন জমিতে। জমির পরিমাণ ও ফলন দেখে বিঘা চুক্তি সেসব মরিচ কিনে নিচ্ছেন আগাম। প্রতি বিঘার মরিচ কেনা হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায়।আরজমি থেকে আধাপাকা মরিচ কেনা হচ্ছে আকৃতিভেদে ৬০০ টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকা মণ। সেসব মরিচ কেউ আড়তে নিয়ে, কেউ বা দেশের খ্যাতিমান বিভিন্ন কোম্পানির কাছে সরবরাহ করছেন। আর সেসব কোম্পানির মাধ্যমে দেশের বাজার ছাড়িয়ে তা পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশের বাজারেও।শুধু কি কৃষকই লাভবান হচ্ছেন মরিচ চাষে? তা কিন্তু নয়; বরং কৃষকের সাথে সাথে নারী শ্রমিকদের মুখেও আনন্দের ঢেউ নদীর স্রোতের মতো এদিক ওদিক বয়ে যাচ্ছে আপন বেগে। চরাঞ্চলের প্রায় ১০ হাজার নারী শ্রমিকের বাড়তি উপার্জনের ব্যবস্থা হয়েছে এই মরিচ চাষের কারণে। সরেজমিনে এসব নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের খুশির কথা। জমি থেকে মরিচ তোলা ও পরিচর্যার (বাছাই) কাজ মূলত নারী শ্রমিকরাই করে থাকেন। পুরুষের পাশাপাশি মরিচের মৌসুমে নারী শ্রমিকদের বাড়তি আয়ে স্বচ্ছল হচ্ছেন এসব শ্রমজীবী পরিবারগুলো।সুতরাং কৃষিজমির ব্যবহার,কৃষকের আয়,জমি থেকে মরিচ তোলা ও বাছাই কাজে নিয়োজিত শ্রমিকের স্বনির্ভরতা,লাল মরিচের দেশ-বিদেশে স্বাদের সুখ্যাতি সব বিবেচনায় বগুড়ার লাল মরিচের মান নিয়ে যেমন কোন সংশয়ের অবকাশ নেই,ঠিক তেমনি ঝালটাও একটু বেশিই বটে!

এমএম মেহেরুল
লেখক ও চেয়ারম্যান,আলোরপ্রদীপ
ই-মেইলঃmeharul.islam.1991@gmail.com

Check Also

দুর্জয় সাহিত্য গোষ্ঠীর দুই যুগ পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রস্তুতিমূলক সভা

আব্দুর রাজ্জাক, স্টাফ রিপোর্টারঃ সোনাতলার ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন দুর্জয় সাহিত্য গোষ্ঠীর গৌরবময় দুই যুগ পূর্তি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 − three =