সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয় এবং রুদালীদের প্রয়োজনীয়তা—স্বপন কুমার সরকার

পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয় এবং রুদালীদের প্রয়োজনীয়তা—স্বপন কুমার সরকার

মহাশ্বেতা দেবীর একটি বড় গল্প রুদালী। নারী প্রধান এই গল্পে উঠে এসেছে ভারতের টাহাড় গ্রামের আদিবাসী সংখ্যাগুরু গন্জু সম্প্রদায়ের এক নারী শনিচরীর জীবন সংগ্রামের কথা। তিন বেলা খাবার জোটেনা। খাদ্য সংগ্রহের কারণে শ্বশুড়, স্বামী এবং সন্তানের মৃত্যুতেও সে কাঁদতে পারেনি। এদেরকে পেশাগত কারণে বলা হয় রুদালী।
রুদালীদের দেখা আজও পাওয়া যায রাজস্থানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। প্রভাবশালীদের মৃত্যুতে কান্না করাই তাদের পেশা।কান্নার সময় পরতে হয় কালো কাপড়।কখনো কখনো টানা ১২ দিনও কাঁদতে হয়।তবে, পারিশ্রমিক খুব বেশি নয়। আজ থেকে ৩০/৩৫ বছর পূর্বে মাত্র ৫ রুপি,আর ছিলো নিম্ন মানের কাপড় এবং খাবার। একটু ভালোভাবে বাঁচার জন্য অভিজাত কারো মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে থাকতে হতো তাদের। অসুস্থ হলে রুদালীদেরকে খবর দেওয়া হতো। মারা গেলেই তাঁরা কান্না শুরু করবে। ঘরের মানুষের জন্য কান্না করার সময় কই? তাদেরকে সম্পত্তির হিসেব করতে হবে না। তবে যত যাই হোক রুদালীদের সংগ্রাম থামেনি। নিজের জন্য কান্না রেখে, পরের জন্য কান্না করাই যেন নিয়তি।
বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রুদালীদের ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পরেছে। এর পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয় এবং একাধিক অনু পরিবারের সৃষ্টি। যার ফলে মানবসভ্যতা ফিরে পেয়েছে তাদের আদিম স্তর। তখনকার দিনে মানুষ নিজেকে সবসময় একা রাখতে পছন্দ করতো, যার চূড়ান্ত পর্যায় বর্তমান সময়ের আলোচিত অনু পরিবার। যেখানে সন্তান পিতা মাতার খোঁজ রাখতে পারেনা। প্রয়োজন হয়ে পরে বৃদ্ধাশ্রমের। যেখানে তাদের মৃত্যুপরবর্তী সময়ে অতি প্রয়োজনীয় হয়ে পরে মহাশ্বেতাদেবীর রুদালীদেরকে।
প্রাচীনকালের মানুষেরা তাদের কৃতকর্মের জন্য কারো কাছে (সেটা হোক পরিবার বা সমাজ) দায়বদ্ধ ছিলো না। কারো বিপদে কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতো না। কারন তাঁরা জানতো না কিভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা যায়।
কিন্তু বর্তমান বিশ্বের এই একুশ শতকের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সময়ের দাবী দুপায়ে ঠেলে তাঁরা নব্য সমাজে তাদের মঙ্গলের এবং উন্নতির চিন্তাভাবনায় নিজেকে জড়িয়ে পারিবারিক সম্প্রীতি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করছে প্রতিনিয়ত।

বাংলাদেশেও তাই আজ রুদালীদের ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পরেছে। অস্বাভাবিকভাবে চাহিদার প্রয়োজনের কাছে সমাজ এবং পরিবার আজ জিম্মি। নিজেদের প্রয়োজনে আজ ভুলতে বসেছি আমাদের পরিবারতন্ত্রকে। ভুলে গিয়েছি আমাদের সবচেয়ে বড় সত্য মৃত্যুকে।এমন পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের মৃত্যুর পর কান্না করার জন্য মহাশ্বেতা দেবীর রুদালীদেরকে আমাদের না প্রয়োজন হয়ে পরে।ভালো থাকুক রুদালীরা,ভালো থাকুক পারিবারিক বন্ধন।

( লেখক কলেজ শিক্ষিক)

Check Also

ফাগুন যায় ফাগুন আসে, কিংবদন্তি জহির রায়হান আসে না

ফাগুন যায় ফাগুন আসে, কিংবদন্তি জহির রায়হান আসে না

ফাগুন যায় ফাগুন আসে কিন্তু আমাদের প্রিয় জহির রায়হান আর আসে না। জহির রায়হান; একটি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 + eleven =