সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / প্রসঙ্গ মধুমেহ —- হাবিবুর রহমান ব্রতচারী

প্রসঙ্গ মধুমেহ —- হাবিবুর রহমান ব্রতচারী

মধুমেহ বা ডায়াবেটিস নতুন কোন রোগ নয়। বহুকাল আগে থেকেই এ রোগের অস্তিত্ব মানুষের জানা ছিল। মানুষ যখন সভ্য হয়ে সমাজবদ্ধ জীবে পরিণত হলো তখন থেকেই এটি তার সঙ্গী হয়েছে। রক্তে চিনির পরিমাণ বাড়ছে কি-না তা জানলে প্রস্রাবের সঙ্গেও যে চিনি বের হতে পারে সেটা বের করতে পিঁপড়েরাই প্রথম সাহায ̈ করেছে। আর তাই সুপ্রাচীন চিকিৎসাশাস্ত্র আয়ুর্বেদ এ রোগের নাম দিয়েছে মধুমেহ। অনেকে একে ভুল করে বহুমূত্র রোগ বলেন। বহুমূত্র আর মধুমেহ দুটোই ডায়াবেটিস হলেও এক রোগ নয়। বহুমূত্র রোগ শরীরের হরমোনের গণ্ডগোলের ফলে হওয়া
একটি রোগ যাতে রোগীর প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যায়,কিন্তু রক্তে বা প্রস্রাবে কোন চিনি বা গ্লুকোজ থাকেনা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান অবশ্য এটিকে ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস বা শর্করা বিহীন ডায়াবেটিস নাম দিয়েছে। আর মধুমেহতেও প্র ̄ধাবের পরিমাণতো বাড়েই, কিন্তু এক্ষেত্রে প্রস্রাবে বা রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে। যাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে ‘ডায়াবেটিস মেলিটাস বা শর্করায় ডায়াবেটিস বলা হয়ে থাকে। তবে মনে রাখার জন্য ̈ মধুমেহ নামটাই সহজ। কারণ মধুর সাথে চিনির সম্পর্ক বোঝাটা মোটেই কঠিন নয়। উদ্বেগের বিষয় হলো পৃথিবীতে এখন এ রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। গত দশ বছরের পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে বিশ্বে মধুমেহ রোগীর সংখ্যা লাগামহীনভাবে বাড়ছে। কিন্তু এই মধুমেহতো ছোঁয়াচে কোন রোগ নয়,তবে এত ছড়াচ্ছে কেন এই রোগ? শুধু যদি বংশগত কারণ
হতো তবে লোকসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও শতকরা হার বাড়তনা। যেটা দেখা গেছে বিশ্বের সবদেশে এমনকি আমাদের দেশের রিপোর্টেও। শতকরা হার বাড়ছে, অর্থাৎ বংশগতির বাইরেও এই রোগের প্রকোপ হচ্ছে। কি সেই কারণ যার জন ̈ এই রোগ বেড়েই চলেছে? প্রথম যে কারণ সেটা হলো সভ্যতা। তার মানে যাই হোক না কেন, সভ্যতা একটা প্রাথমিক অবদান হচ্ছে প্রাকৃতিক খাবার থেকে দূরে সরে যাওয়া। বিদেশে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। স্বাদ বাড়ানো ও সময় বাঁচানোর জন্য খাদ্যের যে পরিমার্জন করা হয় তাতে খাদ্য মানুষের পক্ষে কমবেশি অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। আর সেই অস্বাভাবিক খাবারই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ায়। প্রাকৃতিক খাবারে খাদ্য উপাদান এমনভাবে থাকে যা শরীরের উপরে হঠাৎ কোন চাপ ফেলেনা। শর্করা বা শ্বেতসারের সঙ্গে থাকে তন্তু বা ফাইবার যা শর্করা শোষণকে প্রলম্বিত করে। কিন্তু
এ খাদ্যকেই যখন কৃত্রিমভাবে শোধন বা রিফাইন করা হয়, তখন এই গুণগুলো চলে যায়। এর একটা বড় উদাহরণ হলো লাল আটা এবং ময়দা। লাল আটার ভূষি এবং ̧গুনাগুণ বাদ দিয়ে শুধু স্বাদ বাড়াবার জন্য তৈরি হয় ময়দা। আটা শরীরের পক্ষে কিংবা মধুমেহের পক্ষে ভালো, ময়দা ক্ষতিকর। আমাদের গ্রামাঞ্চলে মধুমেহ রোগীর সংখ্যা শহরের চেয়ে অনেক কম, প্রায় অর্ধেক। হয়তো তারা গ্রামে তথাকথিত সভ্য খাবার খায়না
বলেই এমনটি হয়েছে। তবে ইদানিংকালে গ্রামে সভ্যতার ছোঁয়া লেগে গেছে। দশ বছর আগের গ্রামের রিপোর্টের তুলনা করে দেখা যাচ্ছে যে,
এখন গ্রামেও তিন-চার শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এই মধুমেহ রোগী। একটা কথা সত্যি যে, বেশি করে রোগী সামনে আসার একটা কারণ হচ্ছে বেশি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অর্থাৎ এখন অনেক বেশি লোকে রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে, যা আগে হতোনা। কিন্তু তা সত্বেও রোগ যে বাড়ছে তাতে কোন সন্দেহ নাই। মধুমেহ বা এই ডায়াবেটিস হলো সারাজীবনের রোগ, সর্দি কাশির মতো নয় যে সারিয়ে দিলাম, রোগীর সংখ্যা কমে গেল। একবার যার হলো তো তার নাম পাকাপাকিভাবে খাতায় উঠে গেল। এই রোগ ক্যান্সারের মতো ঝটপট মেরেও ফেলেনা। ঠিকমতো চিকিৎসা আর নিয়মে চললে সুস্থভাবেই বেঁচে থাকা যায়। তাই অন্যান্য যে কোন রোগের চাইতে এ মধুমেহ বা ডায়াবেটিসে লোকশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বেশি। এটি এমন একটি রোগ যাতে ভাল থাকা বা না থাকা প্রায় সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে রোগীর নিজের শিক্ষা ও শৃঙ্খলার উপর। নিজের খাওয়া-দাওয়া, পরিশ্রম, নেশা-সবকিছুকে একটা সীমার ভেতর আনতে পারলে মধুমেহ রোগীদের সুস্থ থাকা সম্ভব। কিন্তু আমাদের প্রচলিত জীবনধারা এতই জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ যে সঠিক খাদ্য নির্বাচন করে খাওয়া প্রতিনিয়ত খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও একটুখানি সচেতনতা আর রসনা সংযম করে চলতে পারলে অন্যসব বন্ধুবান্ধবদের মতো আপনার পক্ষেও মাঝে মাঝে ভোজসভায় যোগদান অসম্ভব কিছু নয়।

(হাবিবুর রহমান ব্রতচারী- প্রধান সেবক, আদর্শ সেবালয় ও প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ, টিএমএসএস আয়ুর্বেদিক কলেজ, বগুড়া)

Check Also

ইতিহাসের রাখাল রাজারা জীবিত থাকে চেতনায়

সম্পাদকীয়ঃ টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া ছোট্ট খোকা কালক্রমে মানুষকে ভালবেসে স্বমহিমায় হয়ে উঠলেন জনতার মুজিব, বঙ্গবন্ধু, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 13 =