সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / প্রাথমিক শিক্ষার হালচাল-এম মেহেরুল

প্রাথমিক শিক্ষার হালচাল-এম মেহেরুল

বেশ কিছুদিন সমগ্র দেশের রাস্তা-ঘাট, চায়ের টেবিল-বাস-স্টিমার-রেলের কম্পার্টমেন্ট, অফিস-আদালত এবং যেখানে জাতীয় সব সমস্যার সমাধান হয় সেই টিভি-টকশোসহ সর্বত্র একটিই প্রসঙ্গ নিয়ে কথার তুবড়ি ছড়াচ্ছে সকলে। কী হচ্ছে আমাদের স্কুলে!
প্রাথমিক শিক্ষাকে আমরা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে চাই। কেননা এটি হচ্ছে কোনো মানুষের জন্য সেই ভিত্তি যা তার জন্য সারাজীবনের সম্পদ ও পথ চলার পাথেয়। একজন মানুষের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হলে পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার ধাপগুলোয় সে স্বাভাবিকভাবেই ভালো করতে পারবে। তাই শিক্ষাবিদরা প্রাথমিক শিক্ষাকে মানুষ গড়ার আঁতুড় ঘর হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। পৃথিবীর সব দেশেই প্রাথমিক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় অনেক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এসব পরিবর্তনের বেশিরভাগই ইতিবাচক পরিবর্তন। প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার হার বাড়ছে, শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়ছে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। বাড়ছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্র। বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীরা মহাসমারোহে নতুন বই পাচ্ছে, গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পাচ্ছে, প্রতিবছর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমছে, এগুলো বাংলাদেশের জন্য অনেক গৌরবের বিষয়। এতসব অগ্রগতি সত্ত্বেও বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যেগুলো এ শিক্ষাব্যবস্থার অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে, বাধাগ্রস্ত করছে অগ্রগতিকে।
পাঠ্যবইয়ের বিষয়ে কথা বলতে গেলে ‘বইয়ের বোঝা’ কথাটিও সামনে চলে আসে। শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা বারবার বলছেন, শিশুদের ওপর যাতে বই বোঝা হিসেবে না দাঁড়ায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটাই হচ্ছে। সরকার যতই পাঠ্যবই নির্দিষ্ট করে দিক না কেন, সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সেই নির্দেশনা মানছে না। যার ফলে নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ের প্রায় দ্বিগুণ, কখনো তারও বেশি বই-গাইড নিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত স্কুলে যাচ্ছে। বইয়ের ভারে শিশু শিক্ষার্থীরা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। আনন্দময় শিক্ষা গ্রহণের পরিবর্তে তারা ব্যাগভর্তি বইয়ের বোঝা টানছে। দেশের কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলোর হাল আরও বেহাল। সেখানে বইয়ের বোঝা আরও বেশি। সরকার কিন্ডার গার্টেনের প্রতি স্বাভাবিক দৃষ্টি রাখে না, সেই সুযোগে তারা যা ইচ্ছে তা-ই করছে।
কোচিং-বাণিজ্য শিক্ষাব্যবস্থার আরও বহুল আলোচিত-সমালোচিত বিষয়। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী কোচিং-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে নেমে খুব একটা সফলতার মুখ দেখতে পারেননি। এ দায়ও তিনি স্বীকার করে কোচিং-বাণিজ্য বন্ধের প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে বলেছেন। আমরা খুব বিস্মিত হয়ে লক্ষ করি, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সকাল-বিকাল-সন্ধ্যা কোচিং সেন্টার অথবা প্রাইভেট টিচারের কাছে দৌড়াচ্ছে। প্রতিবছর পরীক্ষার ফল বেরোয়, মিষ্টির দোকানীর চেহারা মিষ্টির মতো টসটস করে। মাস্টার সাহেব যিনি কোচিংয়ের মালিক তাঁর ফ্ল্যাট বাড়ে, জমির পরিমাণ বাড়ে, কোচিং সেন্টারের সংখ্যা বাড়ে। অভিভাবকের পকেটে উঠে সন্তানের জিপিএ-৫, মাসকাবারে বাড়ে দেনা। জাতির শিক্ষা-পরিসংখ্যানে হার বাড়ে সাক্ষর লোকের,—আমরা শিক্ষিত হবার সুযোগ পাই না। আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, কোচিংয়ের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে অনেক শিশু শিক্ষার্থীই খেলাধুলা করার সুযোগ পায় না। ঘুম থেকে উঠে তাদের কাউকে কাউকে প্রাইভেট টিচারের বাসায় মা বা বাবার সঙ্গে ছুটতে হয়, তার পর স্কুল,তার পর আবার কোচিং এবং রাতে হোমওয়ার্ক করতে করতেই এসব শিশু ঘুমিয়ে পড়ে। পরের দিন সেই একই দিনযাপন। ফলে স্বাভাবিক পরিবেশ ও আনন্দ বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। নিরানন্দে ছেয়ে গেছে তাদের মুহূর্তগুলো। এ কারণে শিক্ষার্জন তাদের কাছে জোর করে গলধঃকরণ ছাড়া ভিন্ন কিছু মনে না হওয়াই স্বাভাবিক। এমন দিনযাপনের মধ্যে যেসব শিক্ষার্থী বেড়ে ওঠে, তাদের মানসিক বিকাশ কতটুকু হয় তা প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক। শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি এ জন্য আমাদের অভিভাবকদের মধ্যে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব কম দায়ী নয়। প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আমরা ভুলে যাই, আমার শিশুটির ওপর মানসিক চাপ পড়ছে কিনা, বই বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা। পৃথিবীর অনেক দেশ রয়েছে সেখানে শিশুদের কথা চিন্তা করে প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষা কম রাখা হয়েছে। আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা পড়ছে কিনা তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদেরও এমন গুরুত্ব দেওয়ার কথা কাগজে-কলমে আছে। এ যেন কাজির গরু কেতাবে আছে কিন্তু গোয়ালে নেই!
সহশিক্ষা কার্যক্রমের কথা একটু বলতে হয়। সরকারের এ বিষয়ে জোরালো উদ্যোগ রয়েছে। প্রতিবছর বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নবোদ্যম আমরা লক্ষ করেছি।কিন্তু সেখানেও স্বাভাবিক অংশ গ্রহনের ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রচন্ড অনীহা। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কর্তাগন তো শিক্ষার্থীদের বলেই দেন খেলায় জেতার দরকার নাই কোন রকম খেলে আয়।এই যে সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করার পেছনে ঐ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অনিহা কারন তারা শুধু শিক্ষাপ্রদানের সঙ্গেই নিজেকে নিয়োজিত রাখেননি।নানা কাজে তিনি ব্যস্ত তাই তার পক্ষে খেলায় জিতিয়ে দলকে জেলা,বিভাগ,জাতীয় পর্বে নিয়ে যাওয়াটা এক ধরনের বোঝা বা বিরক্তির কারন। সঙ্গে সঙ্গে এটাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যদি কোচিং-বাণিজ্য, বইয়ের বোঝা না কমানো যায়, তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই সহ-পাঠক্রমিক কার্যক্রম থেকে দূরে চলে যাবে।পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। শ্রেণিকক্ষ যেন নিরাপদ, সুন্দর হয়।শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট এর ব্যাবস্থা থাকে। আমাদের কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে গিয়ে ভবনধসের আতঙ্কে ভুগবে, খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করবে আমরা এমনটি প্রত্যাশা করি না। অভিভাবক সমাবেশ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা উপকরণ থেকে দৃষ্টি সরালে চলবে না। প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে হালকা করে দেখার ফল হবে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, কোচিং-বাণিজ্য রোধ, বইয়ের বোঝা দূর করতে অতিদ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং কাঙ্ক্ষিত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠন তরান্বিত করবে।

Check Also

বগুড়ায় মুজিবশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে সোনাতলা থিয়েটারের নাটক

বাঙালি বার্তা ডেস্কঃ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বগুড়ার উদ্যোগে ও জেলা প্রশাসন বগুড়ার সহযোগিতায় মুজিবশতবর্ষ ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − 12 =