সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / ফেব্রুয়ারি ও প্রাণের মাতৃভাষা–সাকি সোহাগ

ফেব্রুয়ারি ও প্রাণের মাতৃভাষা–সাকি সোহাগ

আমি কর্মসূত্রে যখন ঢাকায় ছিলাম; তখন আমার সেখানকার বন্ধুরা বলতো- ওই ব্যাটা আছোস
কেমন? বা কেমন আছোস? আমিও হয়তো বলতাম- আছি ব্যাটা ভালাই। তারপর ২০১৬ সালে কর্মসূত্রে চট্টগ্রাম ছিলাম। সেখানকার বন্ধুরা বলতো- ওয়া কেন আছো দে? আমি উত্তর দিতাম- গম আছি। অফিসে বরিশালের এক বন্ধু ছিল সেও মাঝেমাঝে খোঁজ নিত- এ মনু তুই আছো কেমন হায়? আমি ওর কথারও উত্তর দিতাম। বাড়িতে এলে মা বলতো- এ বাবা কেংকা আছু? তুই কোমা শুগে গেছু? কিছু খাসনে নেকি? আমি মায়ের কথারও উত্তর দিতাম। এই যে আমাদের একেক অঞ্চলের একেকরকম ভাষা; তাতেও যেন একটা গোপন আনন্দ লুকোচুরি খেলে যায় হৃদয় আলিঙ্গনে। কারণ আমরা অন্তত উর্দু তো বলছি না। আমরা নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলছি। বেলাশেষে মূল যে কথা তা হলো- আমরা বাংলায় কথা বলছি। আমি গর্বিত, আমি বাংলায় কথা বলি; আমার মায়ের ভাষায় কথা বলি। আমার মায়ের মুখের এই বুলির জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছিল রাজপথে ১৯৫২ সালে; তাঁদের কাছে আমরা ঋণী। আমরা তাঁদের কখনোই ভুলতে পারব না। তাঁরা শুধু কি আমাদের বাংলা ভাষার অধিকার এনে দিয়েছিল? তাঁরা আমাদেরকে দিয়েছিল অদম্য সাহস। শোষণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর পাকিস্থান দু’টি খ- মিলে রাষ্ট্র গঠনকার্য শুরু করলো। পশ্চিম পাকিস্তান তথা বর্তমান পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশ মিলে। পূর্ব বাংলা নামটি পরবর্তিতে ১৯৫৫ সালে এসে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করে। সেই ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান আমাদেরকে (তথা পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশ) নানান ভাবে শোষণ করে আসছে। অসহায় জেলে কুমার শ্রমজীবী বাঙালিরা কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। কেউ বুঝে উঠলেও কিছু করার ছিল না সেসময়। মুখ বুঝে সব সহ্য করে যেত। কিন্তু দেশ ভাগের পরপরই ১৯৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা দিলেন পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু। মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবে না, ভাবতেই পারে না বাঙালিরা। এত অন্যায় অবিচার শোষণ সহ্য করে আসছিল পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু এখন আর না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মায়ের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ঘোষণা শোনার পর বাঙালিরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। নেমে পরে রাজপথে। তারা মায়ের ভাষার বিকল্প কিছু চায় না। সারা ঢাকা শহরে ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করলেন। এই ঘোষণা তারা মানতে পারবে না। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার এই আন্দোলন দেখে ১৪৪ ধারা জারি করলেন। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ১৯৪৮ সালে শুরু হলেও এর শেষ হয় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এসে। দেশ ভাগের পর ১৯৪৭-১৯৫২ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলনই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক একটি বড় আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। যা আমাদেরকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ করতে সাহস জুগিয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজ ছাত্ররা একজোট ছিল। সকাল নয়টায় ঢাকার ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে একটা মিছিল নিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের মিছিল। নিজেদের মায়ের ভাষাকে আপন করে নেওয়ার মিছিল। কিন্তু তারা বেশি দূর যেতে পারেনি। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার নামে সেদিন পুলিশ গুলি চালায় এলোপাথাড়ি ভাবে সেই আন্দোলনকারীদের উপর। গুলি চালায় সোনার ছেলেদের উপর। লাল সবুজের উপর। গুলি এসে বিঁধেছিল সেদিন লাল সবুজের বুকে। বাংলার মানুষের বুকে। সেই গুলিতে প্রাণ দিয়ে রক্তাক্ত হয়েছিল রফিক(রফিকউদ্দিন আহমদ ১৯২৬-১৯৫২), সালাম(আবদুস সালাম ১৯২৫-১৯৫২), বরকত(আবুল বরকত ১৯২৭-১৯৫২), জব্বার (আবদুল জব্বার ১৯১৯-১৯৫২) সহ অনেকেই। সেই সাথে প্রায় ১৭জন ছাত্র আহত হয়েছিল। বাংলার মানুষ ভাষা শহীদের রক্ত শুকাতে দেয়নি। পরের দিন ১৯৫২ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা থাকা স্বতেও ২২ ও ২৩ তারিখ হরতাল ডাকে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাহিত্যিকসহ সাধারণ জনতা। সেদিনও রাজপথে হরতাল চলাকালীন সময়ে পুশিলের গুলিতে প্রাণ হারায় বাংলার কামাল ছেলে শফিউর রহমান(১৯১৮-১৯৫২) ও এক আউয়াল নামের রিক্সা চালক। বাংলার দামাল ছেলেরা যেন এবার একদম রুখে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ভাষা রক্ষা করেই ছাড়বে। ২৩ তারিখ রাতে রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণে ভাষা শদীদদের সম্মানের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলে শহীদ মিনার। যা পরের দিন ১৯৫২ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি শুভ উদ্বোধন করেন ২২শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো ভাষা শহীদ শফিউর রহমানের পিতা। তার দুই দিন পর অর্থাৎ ২৬শে ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর প্রতীক শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার স¤পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। চলতে থাকা এই গণআন্দোলনের মুখে নতি স্বীকার করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালের ৭ই মে বাধ্য হয়ে পূর্ব পাকিস্তানীদের মায়ের ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়। যা পরবর্তি সময়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তাই ২১শে ফেব্রুয়ারি বৈশ্বিক পর্যায়ে গভীর শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে পালন করা হয়।

Check Also

প্রজন্মের কবি সাজেদুর আবেদীন শান্ত’র কবিতার বই ‘আষাঢ়, তুই এবং মৃত্যু’ প্রকাশিত

ইকবাল কবির লেমনঃ প্রজন্মের কবি সাজেদুর আবেদীন শান্ত’র কবিতার বই ‘আষাঢ়, তুই এবং মৃত্যু’ প্রকাশিত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 − 3 =