সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / বগুড়ার বিখ্যাত ব্যক্তিত্বঃ বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী

বগুড়ার বিখ্যাত ব্যক্তিত্বঃ বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী

ইকবাল কবির লেমন

বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকীর জন্ম ১০ ডিসেম্বর ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দ (২৭ অগ্রহায়ন ১২৯৫ বঙ্গাব্দ) বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার গ্রামে । তাঁর বাবার নাম রাজনারায়ণ চাকী এবং মায়ের নাম স্বর্ণময়ী চাকী ।রাজনারায়ণ চাকী বগুড়ার নবাব এস্টেটে কর্মরত ছিলেন। ছোট বেলাতেই প্রফুল্ল চাকীর পিতা মারা যান। প্রফুল­ চন্দ্র চাকী নামুজা জ্ঞানপ্রসাদ ইংরেজি বিদ্যালয়ে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন এবং মাইনর পাশ করেন। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি রংপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছিলেন। এরপর তিনি রংপুর জাতীয় স্কুলে ভর্তি হন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্রফুল্ল চাকী তার গ্রামের বাড়িতে ক্লাব, পাঠাগার, ব্যায়ামাগার এবং লাঠি খেলার কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং রংপুরে অধ্যয়নকালীন সময়ে সেখানে কুস্তির আখড়া স্থাপন করেন। বিট্রিশ সাম্রাজ্যবাদী শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে স্বদেশী বিক্ষুব্ধ আন্দোলন শুরু হলে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ”বিপ্লবী গুপ্ত” সমিতির সদস্য হিসেবে তিনি যোগদান করেন। ”বিপ্লবী গুপ্ত” সমিতির সদস্য হিসেবে যোগদানের সময় তিনি বুক চিড়ে রক্ত দিয়ে শপথ করেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি প্রাণ উৎসর্গ করতে কখনো কুণ্ঠিত হবেন না। ”বিপ্লবী গুপ্ত” দলে যোগদান করে ইংরেজ বিরোধী কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়া হয়। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ”বান্ধব” সমিতিতে যোগদানের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে বিপ্লবী দলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে বারীন ঘোষ প্রফুল্লকে কলকাতায় নিয়ে যান এবং পূর্ববঙ্গের ছোট লাট রামফিল্ড ফুলারকে হত্যার চেষ্টায় নিয়োজিত করেন , হত্যা চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি মানিকতলার বোমার আড্ডায় অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিষ্ট্রেট কিংসফোর্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ পাওয়ায় তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিংসফোর্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ লক্ষ করে ব্রিটিশ সরকার কিংসফোর্ডকে মোজাফফরপুর জেলায় জেলা জজ হিসেবে বদলি করে এবং তার নিরাপত্তা জোরদার করে। ২৭ এপ্রিল ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী, তার সহযোগী ক্ষুদিরাম বসু মোজাফফরপুর গিয়ে ধর্মশালায় আশ্রয় গ্রহন করেন। ধর্মশালা হতে কাছাকাছি ছিল কিংসফোর্ডের বাংলো। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার থাকায় বাংলোয় ঢুকে কিংসফোর্ডকে হত্যা করা অসম্ভব ছিল না তাঁদের পক্ষে। ২৮ এপ্রিল ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী, তাঁর সহযোগী ক্ষুদিরাম বসু কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দ্যেশে আদালতে গমন করেন কিন্তু অনেক সাধারণ মানুষের প্রাণনাশের সম্ভাবনা থাকায় তাঁদেরকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়। প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, কিংসফোর্ড প্রতিদিন ইউরোপিয়ান ক্লাবে যায় এবং রাত ৮.০০ টায় গাড়িতে চেপে বাংলোতে ফিরে আসেন। এই সুযোগটি কাজে লাগাতে ততপর হন প্রফুল্ল। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে সন্ধ্যায় ফিটন গাড়ী ক্লাব হতে বের হলে, সে গাড়িটিকে কিংসফোর্ডের গাড়ি মনে করে বোমা নিক্ষেপ করে। কিন্তু গাড়িতে মিঃ কেনেডি এবং মিসেসঃ কেনেডি ছিলেন। এ হামলায় চারজন নিহত হন। বোমা বিস্ফোরনের খবর প্রচারিত হলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং হামলাকারীকে ধরার জন্য ৫০০০.০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। মোজাফফরপুর জেলার সমস্ত থানা এবং রেল স্টেশনে দ্রুত খবর পৌঁছানো হয়। সেই রাতে পুলিশ কাউকে খুঁজে পায় নাই। কলকাতার মোজাফফরপুর জেলা হতে ২৪ মাইল পায়ে হেটে ওয়ালী (বর্তমান পুসা) রেল ষ্টেশন খাবার দোকানে তৃষ্ণা মেটাতে গেলে, পূর্বেই অবস্থানরত সাদা পোশাকের পুলিশের হাতে প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী’র সহযোগী ক্ষুদিরাম বসু গ্রেফতার হন। এদিকে বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ট্রেনে করে মোকামঘাঁটে উপস্থিত হন, এই ট্রেনেই দারোগা নন্দনাল বন্দোপাধ্যায় পাহারারত অবস্থায় অবস্থান করছিলেন। ভোরবেলা নন্দনাল বন্দোপাধ্যায় কয়েকজন কনস্টেবল সমেত সন্দেহপূর্বক গ্রেফতার করতে অগ্রসর হলে বিপ্লবী প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী নিজ রিভলভারের সাহায্যে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। পরে তাঁর মরদেহ মোজাফফরপুর এনে তাঁর সহযোগী ক্ষুদিরাম বসুকে দেখানো হয়। ক্ষুদিরাম বসু স্বীকার করেন এটি তার বন্ধু দীনেশ চন্দ্র রায় (প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী’র ছদ্মনাম দীনেশ চন্দ্র রায়) । ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনী মৃত প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী’র শরীর থেকে মাথা আলাদা করে, মাথাটি স্প্রিটে ডুবিয়ে বীভৎস করে ফেলে। কিছুদিন পর ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসি দেয়া হয়। ঐ ঘটনায় সারাদেশে বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারন করে। ওই ঘটনার কিছুদিন পর বিপ্লবীরা দারোগা নন্দনাল বন্দোপাধ্যায়কে হত্যা করে প্রফুল্ল চন্দ্র চাকী’র মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়।

তথ্যসুত্রঃ

বগুড়ার ইতিহাস-প্রভাস চন্দ্র সেন

বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা

উইকিপিডিয়া

ইন্টারনেট

Check Also

কর্মবীর আব্দুল মান্নানঃ তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে জনপ্রিয় জাতীয় নেতা – – ইকবাল কবির লেমন

নিজের মেধা-মনন আর সাহসীকতায় বিশ্বলোকের কেউ কেউ হয়ে ওঠেন স্বত্বায়-চেতনায় স্বকীয়। নাম উচ্চারণ করলেই তাদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × four =