সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / বগুড়ার খবর / বগুড়ায় করতোয়ার গলার কাঁটা মম ইন পার্ক

বগুড়ায় করতোয়ার গলার কাঁটা মম ইন পার্ক

মো. আব্দুল ওয়াদুদ, বগুড়া প্রতিনিধি : করতোয়া নদীর বালুচর দখল করে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে মম ইন নামের বেসরকারী সংস্থার একটি পার্ক। পরিবেশ অধিদপ্তর, সড়ক বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি অফিস অবৈধ স্থাপনাটি উচ্ছেদে একমত হলেও অজ্ঞাত কারনে পেরে উঠতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। বরং বিভিন্ন দফতরে চিঠি দিয়ে অবৈধ স্থাপনাটি রক্ষায় শেষ চেস্টায় রয়েছে এনজিও প্রতিষ্ঠান ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস)। সবর্শেষ গত ১০ এপ্রিল জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দফতর প্রধানকে বিবাদী করে বগুড়ার দেওয়ানী আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছে সংস্থাটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টিএমএসএস একটি ক্ষুদ্রঋণ ভিত্তিক এনজিও প্রতিষ্ঠান। ১৯৮০ সালে বগুড়ায় প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে। এটি একটি নারী ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মপরিধি মোটামোটি সারাদেশে বিস্তৃত হলেও মূল কর্মযজ্ঞ বগুড়া কেন্দ্রিক। টিএমএসএস উদ্যোগে বগুড়া শহরসহ আশপাশে গড়ে উঠেছে বহু কল্যাণমুলক ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান করতে বিভিন্ন সময়ে সরকারি খাস জমি দখলসহ স্থানীয়দের জায়গা নামমাত্র মুল্যে দখল করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে। সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতার আসার পর সারাদেশের নদী দখলমুক্ত করে আপন রূপে ফিরিয়ে আনতে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো তৎপর হয়ে উঠে। ইতোমধ্যে ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গা, তুরাগনদীর তীর দখলমুক্ত করতে দফায় দফায় অভিযান চালানো হয়েছে এবং এখনও চলছে। এসব অভিযানে নদীগুলোর বিরাট অংশ ইতোমধ্যে দখলমুক্ত হয়েছে। সরকার এবং মন্ত্রনালয়ের কড়াকড়ি নির্দেশনার পর করতোয়া নদী দখলমুক্ত করতে তৎপর হয়ে উঠে স্থানীয় প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে গত ৪ এপ্রিল’২০১৯ বগুড়া সদরের নওদাপাড়ার বারবাকপুর মৌজায় করতোয়া নদীর ডানতীরে ঢালের উপর নির্মিত পার্কগেটের মালিকানা নির্ধারণের জন্য টিএমএসএস’র একজন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী, সদর উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ারকে সরেজমিন পরিমাপ করে অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয় বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ঐ দিন ৮ এপ্রিল সকাল ১০টায় জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার সময় নির্ধারণ করে প্রতিনিধি উপস্থিত থাকার জন্য টিএমএসএস’কে চিঠি দেন বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড’র (পওর) নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ। ৮ এপ্রিল সওজ, ভূমি সার্ভেয়ার, জেলা প্রশাসক কার্যালয় এবং টিএমএসএস’র প্রতিনিধির উপস্থিতিতে বারবাকপুর মৌজার ৬৪০৫ নং দাগে সরকারি ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত করতোয়া নদীয় সীমানা সিএস নকসা অনুসারে সরেজমিন পরিমাপ করা হয়। পরিমাপে দেখা যায়- ৬৪০৫ নং খাস খতিয়ানভুক্ত করতোয়া নদীর সিংহভাগ টিএমএসএস’র সহযোগি প্রতিষ্ঠান “মম ইন” পার্কের স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। অবৈধ অংশের স্থাপনাটির পরিমান ০.০৬০৬ একর। অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করার পর তা উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এবং নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট চেয়ে জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানান পওর নির্বাহী প্রকৌশলী। উচ্ছেদ অভিযানের তৎপরতা বুঝতে পেরে ৯ এপ্রিল জমির জরিপ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের উপর নারাজিনামা দেন টিএমএসএস নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম। একই সঙ্গে পওর নির্বাহী প্রকৌশলী অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন। চিঠিতে ড. হোসনে আরা বেগম দাবি করেন- জরিপকালে জেলা প্রশাসনের লোকজন টিএমএসএস’র প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচিত হন নাই এবং জরিপের কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনাও করেননি। পওর নির্বাহী প্রকৌশলী একতরফাভাবে জরিপ করেন এবং ঐ রাতেই অধিনস্ত জনবলের নিকট থেকে তদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করে পরের দিন ৯ এপ্রিল উচ্ছেদ প্রস্তাবনা দাখিল করেন। এর একদিন পরই ১০ এপ্রিল বগুড়া জেলা প্রশাসক, পওর নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করে আদালতে মামলা দায়ের করে টিএমএসএস। মামলাটি আমলে নিয়ে আগামী ২৭ জুন শুনানির দিন ধার্য্য করেছেন আদালত। জানতে চাইলে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, জায়গাটি দখলে রাখতে টিএমএসএস শুরু থেকেই অপচেষ্টা চালাচ্ছে। জরিপ একতরফা হওয়ার সুযোগ নেই। জরিপকাজে টিএমএসএসের প্রতিনিধি ছিলেন এবং তাদের সহযোগিতা নিয়েই জরিপ সম্পন্ন হয়েছে, যার ছবিও আছে। যেহেতু বিষয়টি এখন আদালতে গড়িয়েছে, তাই আদালত যেভাবে বলবেন আমরা সেভাবে এগোবো। বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদেশ রয়েছে। জরিপে খাস জায়গা পাওয়া গেছে। যেহেতু এটি আদালতে উঠেছে, আমরাও কাগজপত্রে জবাব দেব। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সূত্র মতে, এর আগেই করতোরা নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গিয়ে ফিরে এসেছে স্থানীয় প্রশাসন। গত বছরের ১১ এপ্রিল বারবাকপুর মৌজার ৪৪৮০ এবং ৪৪৮১ নং দাগের সওজ সম্পত্তি এবং করতোয়া নদীর ৬৪০৫ দাগের সরকারি খাসজমি পরিমাপ করা হয়। জরিপটি পরিচালনার পর তদন্ত প্রতিবেদনে উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সার্ভেয়ার, সওজ সার্ভেয়ার, পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিদর্শক এবং বগুড়া সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্বাক্ষর করেন। এতে বলা হয়- টিএমএসএস নির্মানাধীন পাকা স্থাপনাটির অধিকাংশ করতোয়া নদীর ৬৪০৫ নং দাগের সরকারি খাস জমিতে অবস্থিত। স্থাপনাটির অবৈধ জমির পরিমান ০.০৬৮৫ একর। ঐ প্রতিবেদনেও জরুরি ভিত্তিতে স্থাপনাটি উচ্ছেদের কথা বলা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ৭ জুলাই অবৈধভাবে নির্মানাধীন পার্কটি পরির্দশন করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানসহ উধ্বর্তন কর্মকর্তাগন। নদীর পানি প্রবাহ সুষ্ঠু নিশ্চিতে নির্মানাধীণ পার্কটি দ্রুত উচ্ছেদের নির্দেশনা দেন তিনি। এরপর গত ৩ মার্চ স্থাপনাটি উচ্ছেদের জন্য ৭ দিনের মধ্যে টিএমএসএসকে চিঠি দেন পওর। অন্যথায় পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থাসহ টিএমএসএসকে উচ্ছেদের ব্যয় বহন করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয় চিঠিতে। উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে পুনরায় জরিপ চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন জানায় টিএমএসএস। জানতে চাইলে পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, বিষয়টি অবগত আছি। টিএমএসএস’র নির্বাহী পরিচালক একটি আবেদন জমা দিয়েছেন। এরপর সংশ্লিষ্টদের ম্যাপসহ সরেজমিন প্রতিবেদন দিতে বলেছি, তারা প্রতিবেদন দিলে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো যাবে। এ প্রসঙ্গে টিএমএসএস’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, সরকারী জায়গা দখল করে নয়, নিজের জায়গাতেই পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে জরিপ করেছেন। জরিপকালে আমি নিজে সেূখানে উপস্থিত ছিলাম এবং তার ছবি আছে। নদীর জায়গায় নয়, টিলার উপর পার্ক করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আদালতে মামলা করেছি। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। আদালতই রায় দেবে টিএমএসএস সঠিক না বেঠিক।

Check Also

সোনাতলায় বিদ্যুৎ বিড়ম্বনায় জনভোগান্তি চরমে

রবিউল ইসলাম শাকিলঃ বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলায় গত কয়েকদিন যাবৎ অতিরিক্ত বিদ্যুৎবিড়ম্বনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

three × 5 =