সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / বগুড়ার খবর / ভাঙনের হুমকিতে সারিয়াকান্দির বন্যা নিয়ন্ত্রণ রিং বাঁধ

ভাঙনের হুমকিতে সারিয়াকান্দির বন্যা নিয়ন্ত্রণ রিং বাঁধ

প্রতিনিধি, সারিয়াকান্দি: বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ রিং বাঁধ ভাঙনের মুখে পরেছে। মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার পানি বাড়লেই বাঁধটি উপচে লোকালয়ের ৪ গ্রাম প্লাবিত হবে। তলিয়ে যাবে কয়েক শত বিঘা জমির ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কয়েক হাজার গ্রামবাসী।
৪ গ্রামের মানুষদের বন্যার পানি হতে রক্ষার্থে স্হানীয় সংসদ সদস্যের সহায়তায় বাঁধটি নির্মাণ করেন গ্রামবাসী। গত আগষ্ট মাসের প্রথম দিকেই বাঁধের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। বাঁধটি কামালপুর ইউনিয়নের রৌহাদহ ক্রসবাঁধ হতে ফকির পাড়ার টিটুর মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭ শত মিটার লম্বা।
গত কয়েকদিন ধরেই যমুনার পানি বৃদ্ধিতে বাঁধটির উপর দিয়ে পানি উপচে পরার মত অবস্হার সৃষ্টি হয়েছে। হয়তোবা আর মাত্র ৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেলে উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকবে। এছাড়া বাঁধটির বিভিন্ন স্হান ভেঙে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
বাঁধটিকে ভাঙনের হাত হতে রক্ষা করতে সারিয়াকান্দি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগীতায় ভাঙন কবলিত পয়েন্টে মাটিভর্তি সিনথেটিক ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
বাঁধটি ভেঙে গেলে ইউনিয়নের রৌহাদহ, ফকিরপাড়া, কামালপুর এবং ইছামারা গ্রামের ৫ শত পরিবার পানিবন্দী হয়ে পরবেন। ফলে তাদেরকে তাদের গবাদিপশু নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিতে হবে। এতে ৪ গ্রামের ৭ হাজার মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগের স্বীকার হবেন।
সারিয়াকান্দি কৃষি অফিসের তথ্যমতে, বাঁধটি ভেঙে গেলে গ্রামগুলোর ১ শত হেক্টর কৃষিজমি তলিয়ে যাবে। এসব কৃষিজমির সদ্য বেড়ে ওঠা আমন ধান, মাসকলাই, নাবী জাতের ধানের বীজতলা পানি দাঁড়া আক্রান্ত হবে।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে চারটি গ্রামে রয়েছে ২০ টির বেশি মজুদ পুকুর। যেখানে মাছ চাষীরা বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছের মিশ্র চাষ করেছেন। বাঁধটি ভেঙে গেলে নিমিষেই ভেসে যাবে সবগুলো পুকুরের মাছ।
রৌহাদহ গ্রামবাসী কৃষক বাবলু মিয়া বলেন, প্রতিবছর বন্যায় আমাদের ৪ গ্রামের লোকজন এবং গবাদিপশুসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ঝুপরিতে আশ্রয় নেই। আমরা যেখানে শুয়ে থাকি তার প্বার্শে দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। রাতে শুয়ে মনে হয় আমার শরীরের উপর দিয়েই যানগুলো যাচ্ছে। এছাড়া প্রতিবছর আমাদের ফসলাদি বন্যায় নষ্ট হয়ে যায়। তাই গ্রামবাসী একত্র হয়ে জনপ্রতিনিধিদের সহযোগীতায় বাঁধটি নির্মাণ করেছিলাম। আমাদের নির্মিত এ বাঁধটি এখন ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সীমাহীন কষ্টে দিনাতিপাত করব।
স্হানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হেদাইতুল ইসলাম বলেন, ফকির পাড়া, ইছামারা এবং রৌহাদহ গ্রামবাসীর উদ্যোগে মাত্র কয়েকদিন আগেই বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল। বাঁধটি এখন ভাঙনের হুমকিতে পরেছে। বাঁধটি ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযো্গিতা চাই।
সারিয়াকান্দি পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ সহকারী প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবিব বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় আমাদের সহায়তায় বাঁধটিকে রক্ষা করতে ভাঙন কবলিত পয়েন্টে সিনথেটিক ব্যাগ ফেলানো হচ্ছে।
সারিয়াকান্দি- সোনাতলা আসনের সংসদ সদস্য সাহাদারা মান্নান বলেন, বন্যা হতে তিন গ্রামের মানুষের জানমান রক্ষার্থে এবং কয়েক হেক্টর কৃষি জমির ফসল রক্ষা করতে আমার নিজস্ব অর্থায়নে গ্রামবাসীর সহায়তায় বাঁধটি নির্মাণ করেছিলাম। যমুনায় পানিবৃদ্ধিতে বাঁধটি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। বাঁধটিকে ভাঙনের হাত হতে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এদিকে উপজেলায় বন্যা পরিস্হিতি দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। বহুড়া সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি এখন ৭১ সে মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তলিয়ে যাচ্ছে বাড়ীঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, টিউবওয়েল, ল্যাট্রিন। ভেসে যাচ্ছে পুকুরের মাছ।

সারিয়াকান্দিতে দায়িত্বে থাকা গেজ রিডার পরশুরাম জানিয়েছেন, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত যমুনা নদীতে সারিয়াকান্দি পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৭.৩৯ সেন্টিমিটার , যা বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে বাঙালী নদীতে পানির উচ্চতা ছিল ১৫.৭৮ সেন্টিমিটার যা বিপদসীমার মাত্র ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রশাসন অফিসের তথ্যমতে উপজেলার চরাঞ্চলসহ সর্বমোট ৫০ হাজার ৮ শত মানুষ এখন পানিবন্দী। যমুনার পানিতে তলিয়ে গেছে ৬৮ টি গ্রাম। সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছেন বন্যা কবলিত ১২ হাজার ৭ শত পরিবার। এছাড়া উপজেলার ২৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এখন বইছে যমুনার স্রোত।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের উপ নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ জানিয়েছেন, উপজেলার পৌরসভাসহ ১০ টি ইউনিয়নের মানুষ এখন বন্যা কবলিত। উপজেলার ৫ হাজার ৭ শত ৯১ টি নলকূপ এখন পানির নীচে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সমপরিমাণ ল্যাট্রিন। টিউবওয়েল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির অভাব সৃষ্টি হয়েছে। বন্যার্তদের সাহায্যার্থে ৪০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং ১ শত ৫০ টি পানির জারকিন বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া উপজেলার প্রাণি সম্পদ অফিসের তথ্যমতে ৬ হাজার ৫ শত গবাদিপশু পানিবন্দী হয়েছে। পশুখাদ্য তলিয়ে যাওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছে গবাদিপশু।

সারিয়াকান্দি উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, যমুনা এবং বাঙালী নদীর পানি বৃদ্ধিতে উপজেলার ৮১ টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মাছ চাষীরা।

উপজেলার কৃষি অফিসের তথ্যমতে ২১৬ হেক্টর কৃষিজমির ফসল এখন পানিতে নিমজ্জিত। ৫৫ হেক্টর এর মধ্যে ২৩ হেক্টর মাসকলাই, ৭০ হেক্টর এর মধ্যে ১২ হেক্টর সবজি, ১০ হাজার ১ শত ২০ হেক্টর এর মধ্যে ১৬৩ হেক্টর রোপা আমন, ১ শত ৭০ হেক্টর এর মধ্যে ১৯ হেক্টর নাবী জাতের রোপা আমনের বাীজতলা পানিতে আক্রান্ত হয়েছে।

Check Also

শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) বগুড়ার স্মারকলিপি পেশ

নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপে অবস্থিত সজীব গ্রুপের হাসেম ফুডস‘র সেজান জুস কারখানায় গত ৮ জুলাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 3 =