সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / ফিচার সংবাদ / ভূমি ব্যবস্থাপনায় আইনের প্রয়োগ ও মূল্যায়ণ—অ্যাডভোকেট মোঃ আব্দুল মালেক

ভূমি ব্যবস্থাপনায় আইনের প্রয়োগ ও মূল্যায়ণ—অ্যাডভোকেট মোঃ আব্দুল মালেক

সুজলা-সুফলা, সম্পদে সমৃদ্ধ এদেশের ভূমি খুব ঊর্বর ছিল। বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠি সম্পদ লুন্ঠনের লোভে বহুবার এদেশে এসেছে। কেউ এসেছে ব্যবসা বাণিজ্যের অযুহাতে। কেউ এসেছে সাম্রাজ্য বিস্তার করে শাসন করতে। এক এক সময়ে এক এক জাতির ও গোষ্ঠির শাসন ব্যবস্থায় আইন কানুনও এক এক রকম ছিল। ভূমি ব্যবস্থাপনাও ছিল আলাদা আলাদা প্রকৃতির। বার ভূইঁয়াদের ও মোঘল আমলে যে ব্যক্তি যত বন জঙ্গল পরিস্কার করে চাষাবাদ করত, সে তত জমির মালিক ছিল। রাজা বা শাসকগণ দেশীয় আইনের দ্বারা শুধু মাত্র কর সংগ্রহ করতেন। ভূমির স্বত্ত্ব লাভ ও পরিমাপের তেমন কোন ব্যবস্থা ছিলনা। ১৭৫৭ সালে পলাশী প্রান্তে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজ কোম্পানী ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাৎসরিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বাংলা, বিহার ও ঊড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। কোম্পানীর কর্মচারীরা ভূমি রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে এক এক সময়ে এক এক নিয়ম চালু করে। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস এর সুপারিশে প্রত্যেক জেলায় দেওয়ানী আদালত স্থাপন করা হয়। নায়েবে-নাযিমের পদ রহিত করে গভর্নর এবং কাউন্সিলের উপর রাজস্ব প্রশাসন ন্যস্ত করেন। রাজস্ব প্রশাসন কখনও দুসালা, কখনও পাঁচসালা, দশসালা এবং লর্ড কর্ণওয়ালিস ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা চালু করেন। ভূমি রাজস্ব আদায় ও সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৮৭৫ সালে বেঙ্গল সার্ভে এ্যাক্ট, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেনান্সি এ্যাক্ট, ১৯৪৯ অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ সালে জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন, অর্পিত সম্পত্তি আইন, পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন, ২০০১ সালের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যাপর্ণ আইন সহ ভূমি সম্পর্কিত অনেক আইন ও বিধিমালা রয়েছে। কিন্তু ভূমি আইন শিরোনামে কোন সুগঠিত আইন বাংলাদেশে ছিলনা। ভূমি আইন শিরোনামে একটি সুগঠিত আইনের অভাব বোধ সকলেরই ছিল। বর্তমান ভূমি আইনটি সেই অভাব পূরণ করতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ ভূমি আইন,২০২০ একটি যুগপোযোগী আইন। আইনটির মূল্যায়ণ করার মত বিদ্যা-বুদ্ধি ও জ্ঞানকোনটিই আমার নেই। কিছু কিছু লক্ষণীয় বিষয় পাঠক, ভূমি মালিক ও ফলভোগীদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরার প্রয়াস মাত্র। “অত্র আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী আপত্তি কেইস নিষ্পত্তি ও ২৮ ধারা অনুযায়ী আপীল নিষ্পত্তিকারীর একই পদবী ও মর্যাদার। আবার ৪৫(৬) ধারায় সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গঠিত কমিটির নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির নির্ভরযোগ্যতার মান দন্ড নির্ধারিত নেই। ৪৬(১) ধারায় সীমানা পিলার যে জমিতে অবস্থিত সেই জমির মালিকের দায়,যেন ভয়ে পরিণত না হয়। ৫৫(২)(গ) নিবন্ধনের দশ কর্মদিবসের মধ্যে নিবন্ধন কর্মকর্তা উহা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তাকে অবহিত করিতে ব্যর্থ হইলে কালেক্টরের নিকট তাহার কারণ ব্যাখ্যা করিবে; ৮১(৪)(ঙ) ধারায় নিবন্ধনের পর পরই দলিলের একটি অনুলিপি রাজস্ব কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করিবে যাহা অনলাইনে প্রেরণ করিতে হইবে এবং রাজস্ব কর্মকর্তা নির্ধারিত পদ্ধতিতে রেকর্ড হালনাগাদ করিবেন; (৫)(ক) রাজস্ব কর্মকর্তা দাতা বা বিক্রেতার মালিকানা যাচাই করিয়া গ্রহীতা বা ক্রেতার নামে নামপত্তন করিবেন এবং ক্রেতা বা গ্রহীতার নামে হোল্ডিং খুলিয়া প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের নির্দেশ দিবেন; (খ) গ্রহীতা বা ক্রেতাকে ক্রয় মোতাবেক রেকর্ড হালনাগাদ করিয়া তাহাকে খতিয়ানের একটি সইমোহরকৃত নকল সরবরাহ করিবেন; (গ) রাজস্ব কর্মকর্তা খতিয়ানের লিখন মতে সংশোধনের জন্য নকশা ও একটি খতিয়ানের কপি উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট প্রেরণ করিবেন। যাহার ফলে বিক্রয়ের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরিত হইলে স্বংক্রিয়ভাবে নামজারি বা জমাভাগ হইয়া যাইবে। ভূমির মালিক আলাদা নামজারি বা জমাভাগের ঝামেলা থেকে রক্ষা পাইবেন।৮২(২) ধারায় বলা হইয়াছে এই আইন বা অন্য কোন আইনে যাহাই বলা থাকুক না কেন, মওকুফ ধাপে অবস্থানকারী প্রত্যেক কৃষি জমির স্বত্বাধিকারী নির্ধারিত পরিমাণ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করিয়া দাখিলা গ্রহণ করিতে পারিবেন। কিন্তু ১৯৯৩ সালে তৎকালীন সরকার ২৫ বিঘা পর্যন্ত ভূমির মালিকদের ভুমি রাজস্ব মওকুফ করিয়া হোল্ডিং প্রতি ২.০০ টাকার বিনিময়ে ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফের দাখিলা গ্রহণের বিধান করিয়া ছিলেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর ভূমি মন্ত্রণালয়, আইন অধিশাখা-৩, প্রজ্ঞপন স্বারক নং – ৩১.০০.০০০০.০৪৪.৩৯.০২৫.১৫-৭৭(১২০০) তারিখঃ ৩০ জুন ২০১৫ এ বলা হইয়াছে ভূমি উন্নয়ন করের হার সময়োপযোগী ও ন্যায়ানুগ করিবার লক্ষ্যে সরকার ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইতঃপূর্বে জারিকৃত ৩০/০৫/১৯৯৫ তারিখের প্রজ্ঞাপন নং ভূঃমঃ/শা-৩/কর/১০০/৯২-১০৬(১০০০) বাতিলক্রমে এতদ্বারা ভূমি উন্নয়ন কর অধ্যাদেশ ১৯৭৬ (১৯৯৩ সনের ২৯ নং আইন দ্বারা সংশোধিত) এর ৩(১এ) উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নি¤œরূপ শর্তাধীন এলাকা ও ব্যবস্থারভিত্তিক প্রতি শতাংশ ভূমির বার্ষিক ভূমি উন্নয়ন করের পরিবর্তিত হার নির্ধারণ করিল। ১। (ক) ব্যক্তি ও পরিবারভিত্তিক কৃষি জমির পরিমাণ ৮.২৫ একর (২৫ বিঘা) পর্যন্ত হইলে কোন ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হইবে না। (গ) উল্লেখিত (ক) দফায় বর্ণিত ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফের আওতাধীন কৃষি জমির সংশ্লিষ্ট প্রতিটি হোল্ডিং এর ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফ বাবদ দাখিলা প্রদানের জন্য আবশ্যিকভাবে বার্ষিক ১০.০০ (দশ) টাকা আদায় করিতে হইবে।
এই ভূমি উন্নয়ন কর মওকুফ বাবদ বার্ষিক ১০.০০ (দশ) টাকার বিনিময়ে দাখিলা গ্রহণে ভূমি মালিকগণ শুধু অসচেতনই নহেন তাহারা জানেনই না, তেমনি ভূমি অফিসের কর্মচারীগণ দাখিলা বাবদ ১০.০০ টাকা আদায়ে আগ্রহী নন বরং ভূমি মালিকদের নানা জটিলতা সৃষ্টি করে নিরুৎসাহিত করেন। এর ফলে বছরের পর বছর সরকারের রাজস্ব যেমন বকেয়া থাকিতেছে তেমনি ভূমি মালিকদের দাখিলা বাবদ দায় বৃদ্ধি পাইতেছে। অন্যদিকে ২৫ বিঘার নিচের ভূমির মালিকদের দীর্ঘ দিন খাজনার দাখিলা না থাকায় ভূমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হইতে পারে। অন্যদিকে সরকার ক্ষুদ্র চাষীদের জন্য কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করিলে কৃষকরা কৃষি ঋণ গ্রহনের জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দারস্থ হইলে ঋণদানকারী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান কৃষকের কাছ থেকে ভূমির হালনাগাদ খাজনা রশিদ দাবী করেন। কৃষকগণ দ্রুত বিনা হয়রানিতে হাল নাগাদ খাজনার দাখিলা সংগ্রহ করিতে পারেন না। ফলে ভর্তুকীর হারে কৃষি ঋণ প্রকৃত কৃষক গ্রহণ করিতে পারেন না। তাহাদের পরিবর্তে ঐ কৃষি ঋণ ব্যাংক কর্মচারীদের যোগসাজসে অকৃষককে কৃষিখাতের ঋণ প্রদান করিয়া র্টাগেট পূরণ করেন। আর প্রকৃত কৃষকরা পুজিঁর অভাবে কৃষি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেননা। ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য শস্য বিদেশ থেকে আমদানি করিতে প্রচুর বৈদেশীক মূদ্রা ব্যয় করিতে হইতেছে। তাই নিবেদন থাকবে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারীগণ যেনগ্রামে গ্রামে প্রচারণা চালিয়ে কোন রূপ ঝামেলা ছাড়াইজটিলতা নিরসন করিয়া সহজ উপায়ে ১০.০০ টাকার বিনিময়ে হাল সনের দাখিলা গ্রহণে ভূমি মালিকদের উদ্ভুদ্ধ করেন। প্রয়োজনে ঝামেলা এড়ানোর জন্য পূর্বের বছরগুলোর দাখিলা বাবদ ফী মওকুফ করিয়া বর্তমান সন থেকে হালনাগাদ করা হউক।একই সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির আদলে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের জন্য স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করিলে তাহারা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কাজে সহায়তা করিতে পারিবেন।স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বিশেষতঃ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যগণ কোনভূমি মালিক মৃত্যূবরণ করিলে, ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হইলে তাহার সংবাদ ইউনিয়ন ভূমি কর্মচারীদেরকে সরবরাহ করিতে পারিবেন। ৫৯(চ) ধারা অনুযায়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অন্যতম দায়িত্ব মৃত্যু ভূমি মালিকের ওয়ারিশদের নাম হালনাগাদ করিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে প্রতিবেদন পাঠানো।এই দায়ীত্ব নিয়মিত পালন করিলে ভূমি সংক্রান্ত অর্ধেক জটিলতা কমিয়া যাইবে।একই সাথে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরিত হইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামজারি বা জমাভাগ সম্পন্ন হইবে। ভূমির মালিক আলাদা নামজারি বা জমাভাগের ঝামেলা থেকে রক্ষা পাইবেন। এবিষয়ে ভূমি মন্ত্রী মহোদয়ের সদয় দৃষ্টি কামনা করিতেছি।৮৭(৩) ধারায় বলা হইয়াছে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রেকর্ডীয় জমির শ্রেণী পরিবর্তন করিলে ঐ জমি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হইবে। এই বিধানটি সাধারণ আমজনতার পক্ষে পালন করা খুবই কঠিন হইবে। ইহা প্রয়োগে নমনীয় হওয়া সমীচিন হইবে। ২৬৪ ধারার মাধ্যমে বন্টন, সীমানা বিরোধ, অবৈধ দখল ও জবর দখল বিষয়ে বিচারিক ক্ষমতা বিচারিক আদালত থেকে শাসন বিভাগের হাতে ন্যস্ত করা হইয়াছে। আবার ২৬৫ ধারায় আপীল নিষ্পত্তির জন্য কমিশনের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু এই কমিশন কোন পদবীর কর্মকর্তা দ্বারা গঠিত হইবে তাহা বলা হয়নি। ২৭০ ধারায় প্রদত্ত সরল বিশ^াসে কৃত কোন কর্মের জন্য কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন আদালতে কোন দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা দায়ের করা যাইবেনা।” বিধানটি অতি ব্যাপক ও স্বেচ্ছাচারিতার মদদ দেয়।এটিএকটি সু-সংগঠিত আইন। সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে ভূমি মালিকগণ উপকৃত হবেন। একই সাথে আইনটি সফলতা লাভ করবে এমনটিই প্রত্যাশা।

 

(মোঃ আব্দুল মালেক- অ্যাডভোকেট, জজ কোর্ট, ঢাকা।

E-mail: advamalek@gmail.com, মোবাইল ফোনঃ ০১৭৩১৩৫৪৬০১)

Check Also

শিবগঞ্জে নার্সারি গাছ রোপণের জন্য সিমেন্ট বস্তার তৈরি প্যাকেট যাচ্ছে সাড়া দেশেঃ স্বাবলম্বী হচ্ছে দরিদ্র পরিবার

কামরুল হাসান, শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ বগুড়ার শিবগঞ্জে নার্সারি গাছ রোপনের জন্য সিমেন্ট বস্তার তৈরি প্যাকেট …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 3 =