সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মাদক স্রোতে ভাসছে দেশ – আমরা হাটছি কোন পথে?—এম এম মেহেরুল

মাদক স্রোতে ভাসছে দেশ – আমরা হাটছি কোন পথে?—এম এম মেহেরুল

‘ভাতে করে জাত নষ্ট
প্রেমে নষ্ট কূল;
মাদক করে জীবন নষ্ট
ছিঁড়ে সুখের মূল।’
বর্তমান পৃথিবীতে যত জটিল ও মারাত্মক সমস্যা রয়েছে, তন্মধ্যে মাদকদ্রব্য ও মাদকাশক্তি হলো সবকিছুর শীর্ষে। যুদ্ধবিগ্রহের চেয়েও এটা ভয়ংকর। কারণ কোন যুদ্ধের মাধ্যমে একটি জাতি-গোষ্ঠীকে ধ্বংস করতে চাইলেও একেবারে তা নির্মূল করা সম্ভব নয়; যা কিনা মাদকের মাধ্যমে সম্ভব। বাংলাদেশ মাদকের হিংস্র ছোবলে এখন আক্রান্ত এবং দ্রুত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ এ জাতির এখনও হুঁশ হচ্ছে না। অন্যভাবে বলা যায়, আমাদের সমাজ এখন মাদক ক্যান্সারে আক্রান্ত। যার শেষ পরিণতি অনিবার্য মৃত্যু। দেশগড়ার কারিগর সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে মাদক। মাদকের কারণেই বুক ফাটা কান্নায় পৃথিবীর আকাশ বাতাস ভারি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাতের অন্ধকার আরও নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে পরিবারগুলোতে। অথচ এই তারুণ্যই দেশ, জাতি ও সমাজের উজ্জ্বল নক্ষত্র, জাতির আগামী দিনের কর্ণধার। দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে জাতির মূল চালিকাশক্তি হলো তরুণরাই। তরুণ প্রজন্মই আমাদের দেশ-জাতিকে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে টেনে নেয়ার বিরাট ভূমিকা রাখে এবং রেখে আসছে যুগে যুগে। তবে আমাদের দেশের তরুণ ও যুব সমাজের একাংশ নানাভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে মরণ নেশা মাদকের সঙ্গে। এ নেশা এমনই এক নেশা ধীরে ধীরে বিবর্ণ করে দিচ্ছে আমাদের সবুজ তারুণ্যকে। নষ্ট করে দিচ্ছে দেশের ভবিষ্যত। আমাদের দেশের রয়েছে পর্যাপ্ত তারুণ্যনির্ভর জনশক্তি। দেশের এ মহামূল্যবান সম্পদ মাদকের চোরাচালান ও অপব্যবহারের কবলে পড়ে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। নেশার ছোবলে পড়ে এ যুবসমাজ কর্মশক্তি, সেবার মনোভাব ও সৃজনশীলতা হারিয়ে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে।

বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে ধারনা করা যায় ১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ৷ আর এখানে এখন মাদক হিসেবে ব্যবহারের শীর্ষে রয়েছে ইয়াবা নামের এক ধরনের উত্তেজক ট্যাবলেট৷ এছাড়াও হেরোইন, গাঁজা এবং ফেনসিডিলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য৷ দেশে যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধরা পড়ে, তা বিক্রি হওয়া মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ৷ আর ৯০ শতাংশ মাদকই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে৷ জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ইউএনওডিসি)-র মতে, বাংলাদেশে বছরে শুধু ইয়াবা ট্যাবলেটই বিক্রি হচ্ছে ৪০ কোটির মতো, প্রতিটির দাম দুইশ’ টাকা হিসেবে যার বাজারমূল্য প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ৷ ২০১৭ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে ইয়াবার ব্যবহার ৮০ শতাংশ বেড়েছে৷ আর ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে বেড়েছে ৪৬ শতাংশ৷ ২০১২ সালে মোট মাদকসেবীর মধ্যে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা হয়েছে ৩১ দশমিক ৬১ শতাংশ৷ বর্তমানে সেটা বৃদ্ধি পেয়ে আরো কয়েকগুণ হয়েছে। মাদকাসক্তের সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের সব দেশের মধ্যে সপ্তম৷ মাদকাসক্তরা মাদকদ্রব্য কেনায় বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে৷ যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি আশনি সংকেত।

এখন স্বাভাবিকভাবে আমাদের সামনে প্রশ্ন এসে যায় বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহার কমছে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর প্রায় সবারই জানা৷ বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের অবৈধ অর্থনীতির আকার এখন বেশ বড়৷ যদি বড় ব্যবসায়ী বলা হয়, তাহলে সেরকম মাদক ব্যবসায়ী আছে পাঁচ হাজারেরও বেশি৷ তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিই আছেন৷ এছাড়াও মাদকের খুচরা বিক্রেতা আছে কয়েক হাজার৷ কোনো কোনো মাদকসেবী আবার একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতা হিসেবেও কাজ করেন৷ তাছাড়াও জাতিসংঘ মনে করছে, দক্ষিণ এশিয়াকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে আরও প্রচুর কোকেন পাচার হচ্ছে, যা ধরাই পড়ছে না৷ গার্ডিয়ান বলছে, সম্ভবত ল্যাটিন অ্যামেরিকার একটি সংঘবদ্ধ চক্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে নিজেদের চোরাচালানের রুট আড়াল করতেই দক্ষিণ এশিয়াকে পাচারের পথ হিসেবে ব্যবহার করছে৷ এ অঞ্চলের বন্দরগুলোর দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই এ কাজ করছে তারা৷ এছাড়া মেক্সিকোর সিনালোয়া অথবা প্যাসিফিক কার্টেলের মতো চক্রগুলো এশিয়াকে মাদকের একটি বড় বাজার হিসেবে দেখছে৷

বাংলাদেশের শুধু শহরাঞ্চল নয়, গ্রাম এলাকায়ও পৌছে গেছে মাদক৷ প্রধানত তিনটি কারণে বাংলাদেশে মাদক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে৷
১. চাহিদার সঙ্গে পর্যাপ্ত জোগান।
২. মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত এবং কৌতূহল।
৩. হিরোইজম মাদক সকল অপরাধের মূলে কাজ করে৷
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে উৎপাদিত আফিম দিয়ে চীনকে অর্থনৈতিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করার প্রতিক্রিয়ায় ১৮৩৯ সালে চীনের সম্রাট মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ব্রিটেনের সঙ্গে চীনের এই যুদ্ধই ইতিহাসে প্রথম আফিম-যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই চীন আধুনিক যুগে প্রবেশ করে এবং উন্নতির পথে যাত্রাও সূচিত হয়।বাংলাদেশেও এখন মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনি যুদ্ধ প্রয়োজন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা-সাংসদ এই ব্যবসায় জড়িত। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও কেউ কেউ এসবে জড়িত রয়েছেন।

আগে শুধু ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় ইয়াবার ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন গ্রামগঞ্জের পান দোকানেও এটি পাওয়া যায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে এ সমস্যার মোকাবেলা করা যে,সম্ভব নয় এটা দিবারাতের মতো সত্য।এর প্রতিরোধে দরকার সামাজিক যুদ্ধ।সেই যুদ্ধটি শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকেই।কিন্তু আমরা সেটি করবো কেন? কারনটা আমরা বর্তমানে প্রচণ্ড আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি। নিজের ভালোমন্দ নিয়েই সার্বক্ষনিক চিন্তায় মগ্ন থাকি।নিজের প্রয়োজনেই যে জুতসই সামজিক যুদ্ধটা করা কর্তব্য হয়ে দেখা দিয়েছে সেটি নিয়ে ভাবনার সময় নেই আমাদের।আমরা যেন এখনো জেগেই ঘুমোচ্ছি। অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট মাদকাসক্তের ৯০ শতাংশই কিশোর, যুবক ও ছাত্র-ছাত্রী। যাদের ৫৮ ভাগ ধূমপায়ী এবং ৪৪ ভাগ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। মাদকাসক্তদের গড় বয়স এখন ১৩ বছরে এসে ঠেকেছে।সেই সাথে বিস্ময়কর তথ্য হলো যে, দেশের মোট মাদকসেবীর মধ্যে অর্ধেকই উচ্চশিক্ষিত। দিন-মজুর, রাজমিস্ত্রী, রড মিস্ত্রী, বাস-ট্রাক, বেবী ট্যাক্সী ও রিক্সা চালকদের মধ্যেও বহু মাদকাসক্ত রয়েছে। সবচাইতে মূখ্য কথা হলো মাদকের এই ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে এখনই আমাদের সামাজিকভাবে সোচ্চার হতে হবে।শুধু প্রশাসনের উপর সকল দায়ভার চাপিয়ে আমরা আমাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না।যতোদিন আমাদের ঘুম না ভাঙ্গবে ততদিন পর্যন্ত এই সমস্যা নির্মূল করা মোটেও সম্ভব নয়।

এম এম মেহেরুল
লেখক ও সাবেক চেয়রাম্যান,আলোর প্রদীপ
ই-মেইলঃ meharul.islam.1991@gmail.com

Check Also

কবিতার মহারাজ—আজাদুর রহমান

কবিতা আমার মহারাজ, আমি তার গোলাম। না জানা লোকের মত অজ্ঞাত কাগজ কলম নিয়ে থাকি, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × three =