সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / মোঃ শামীম মিয়ার গল্প ‘মা’

মোঃ শামীম মিয়ার গল্প ‘মা’

Exif_JPEG_420

ছোট মেয়ে ইতি , প্রতিদিনের মতো, তার দাদার হাত ধরে আজও ফজরে বের হয়েছে প্রভাতের বিশুদ্ধ বাতাস, ফুল-ফল, প্রকৃতির সুবাস নিতে। দাদা-দাদী ছাড়া তার খেলার সাথী যেন কেউ নেই। বাবা ঢাকায় চাকরী করেন, মা তার জন্মের কয়েক মাস পর,জটিল এক অসুখে মারা যান। ইতি আজও পুরোপুরি বুঝ নয়। অবুঝ হলেও তার প্রশ্নগুলো আশেপাশের লোকদের চোখের জল বের করেই ছাড়ে।

সবাই মিষ্টি মেয়ে ইতিকে আদর করে, ইতির মনের মধ্যে কি যেন অভাব খেলা করে। দাদা-দাদীকে বলবে, বলতে চায় ইতি, তবে কী ভাবে কোথা থেকে শুরু করবে কথাটা বলতে পারেনা। বলেছে এর আগে, আমার মা কোথায় গেছে,আসবে কবে, মা আমাকে ছেড়ে কেমন করে একা একা থাকে ? মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য বাবা, দাদা-দাদীর কাছে অনেক বায়নাও ধরেছে। তবে কোনদিন ইতি বলেনি ইতির একটা মা চাই ? ইতি মনে মনে ভাবে আমার মা সব মার চাইতে ভালো মা হবে। রাকিব আর জান্নাতির মায়ের চাইতে ভালো। মা আমাকে প্রতিদিন রাতে এবং সকালে পড়াবে। স্কুল ছুটি হলে আমার সাথে খেলবে। আদর করে ছড়া , গল্প , বলবে আর ঘুমিয়ে দিবে। আমি যা চাইবো মা, আমাকে তাই দিবে। আমার শত অপরাধেও মা, আমাকে বকবেনা আমার দাদীর মত। দাদা জমিতে গিয়েছিলো ইতিকে রাস্তায় রেখে,এই সময়ে ইতি কথা গুলো ভাবছিলো। এক বৃদ্ধ ইতিকে বলে গেলো, তোমার বাবা এসেছে। ইতি, দাদা, দাদা বলে ডাকতে থাকে আর বলে, দাদা ভাই, বাবা এসেছে চলো বাড়ি যাই। দাদা ইতির ডাকের কাছে হেরে যায়, একটু পরেই চলে আসে তারা বাড়িতে।

বাবাও ইতিকে খুব ভালোবাসে ইতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। ইতি অনেক দুর থেকেই, বাবা, বাবা বলে দৌড়ে আসে, বাবার কাছে বাবা হাত বাড়িয়ে ইতিকে বুকে জড়িয়ে নেয়, ইতি যেন, বাবাকে পেয়ে পেলো বেহেস্ত আর বাবা, যেন মেয়েকে পেয়ে পেলো তার মাকে।
ইতি বাবাকে বেশ কয়টা চুমা দিলো, বাবাও । বাবা বললো, মা তোমার জন্য অনেক খেলনা এনেছি। ইতি খেলনার দিকে তাকিয়ে র্দীঘশ্বাস ফেলে বললো, বাবা এতো খেলনা দিয়ে কী করবো ? আমার সাথে তো কেউ খেলেনা, বাবা। দাদী সারাদিন রান্নাবান্না আর দাদা দশটার মধ্যে স্কুলে যায়। আমার একা খেলতে ভালো লাগেনা। তার চেয়ে তুমি এবার অনেকদিন থেকো বাবা। বাবারও মনটা খারাপ হয়ে গেলো. বাবার আর বুঝতে বাকী রইলো না আসলে ইতি কী চায়। ইতিকে বাবা বললো, মা আমি তো মাত্র কয়দিনের ছুটি নিয়ে এসেছি তবে এবার তোমার নতুন মা আসবে। তোমার সাথে খেলবে,তোমাকে আদর করবে। বাবার মুখে এমন কথা শুনে, মলিন মুখখানা যেন আনন্দে আলোকিত হলো । পাশে ছিলো ইতির দাদা তিনি একজন স্কুল শিক্ষক তার আর বুঝার বাকী রইলো না তার ছেলে বিয়ে করবে। দাদাও খুশি হলো, এতো বড় বাড়ি সব সময় শূন্য শূন্য লাগে। ইতি বাবাকে বললো,বাবা, মার কি চাঁদের দেশ থেকে আসার আজকেই সময় হলো। বাবা বললো, ঠিক তাই, তবে মাগো, তোমার নতুন মা আজ আসবেনা, দুই একদিনের মধ্যেই আসবে।

আজ ইতির মা আসবে, ইতির মতে, চাঁদের দেশ থেকে , ইতি তাই নতুন জামা কাপড় পড়েছে। তবে ইতির গতকাল থেকে জ্বর । এসেছে ইতিদের বাড়িতে ছোট্ট বড় ফুফুরাও, পূরো বাড়িটা হৈ চৈ এ মুখরিত। ইতির জ্বর বাবা, দাদা-দাদী খোঁজ নিলেও আজকের ব্যস্থতার মধ্যে আগের মত কেউ খোঁজ নিতে পারিনি মা হারা মেয়েটার, কেন যেন ব্যস্থ সবাই। ইতি একটা আপেল ছাড়া সারা দিন কিছুই খাইনি। কেউ যেন আজ ইতির খোঁজ নেয়না। ফুফাতো ভাই বোনেরা, বিশাল আঙ্গিনায় খেলছে, কেউ ইতিকে ডাকেনা খেলতে, ইতিরও ভালো লাগছে না । ইতি বারান্দায় বসে আছে,এমন সময় ইতির এক ফুফাতো ভাই রাসেল এসে বললো, আজ তোর বাবা নিকা করছে ? তোর সৎ মা আসছে, আমদির পাড়া গ্রাম থেকে। ইতি নিকা বুঝেনা, তাই বললো, সৎ মা মানে, আমার মা চাঁদের দেশ থেকে আজকেই আসবে ? বাবা তো তাই বলেছে, তাছাড়া সৎ মানে তো ভালো। দাদা তো প্রায় আমাকে বলে সৎ ভাবে জীবন যেন পরিচালনা করি। রাসেলকে ইতি আগে থেকেই সহ্য করতে পারেনা, তাই বললো, ভাই আপনি যান তো এখন ,আমার ভালো লাগছেনা। রাসেল বললো, ঠিক আছে তবে মনে রাখিস এই সৎ সেই সৎ না, এই সৎ মা, তোকে অনেক র্নিযাতন করবে, খেতে দিবেনা, তোকে দিয়ে অনেক কাজ করে নিবে। ইতির কিছু ভালো লাগছে না। তাই সে তার রুমে চলে গেলো। সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব, বাবাও নেই কোথায় যেন গেছে। দাদাও আজ আর ইতির সাথে কোথাও যায়নি। দাদী ব্যস্ত বড় বড় পাতিলে রান্নাবান্না নিয়ে। ইতির রুমে ইতি একা , আজ মাকেই সব চেয়ে বেশি মনে পড়ছে। মায়ের সাদা-কালো ছবিটা দেওয়ালে ঝুলানো। ছোট্ট ইতি ইচ্ছা করলেই তা ধরতে পারবেনা, তাই ইতি এলোমেলো পড়ার টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারটা অনেক কষ্টে টেনে আনে ছবিটা পারার জন্য। চেয়ারের উপর উঠে ছবিটা পারলো। এবং ইতি তার বিছানায় গেলো। ইতি মনে মনে বলছে, কত ময়লা জমেছে মায়ের ছবির উপর। ইতি তার জামা দিয়ে ছবিটা পরিস্কার করে, সব শেষে একটা মুচকি হেসে বলে আমার মা সত্যি খুব সুন্দর। ইতির শরীরটা যেন জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ইতি কম্বলটা শরীরে দিয়ে মায়ের ছবিটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

বাবা তার বিয়ের বাজার করতেই বাইরে ছিলো। রাত নয়টার দিকে বাবা এসেই ইতি মা, ইতি মা বলে ডাকছে। দাদী বললো, ইতি ঘুমিয়েছে। বাবা ইতির রুমে গিয়ে অবাক হলেন। ইতি মায়ের ছবিটা এমন ভাবে জড়িয়ে বেহেস্তের ঘুম পাড়ছে যেন। যে কেউ পারবেনা ছবিটা খুলে নিতে। বাবা ইতির পাশে বসে ইতিকে দেখছে, ইতির কপালে হাত বুলিয়ে আদর করতেই চমকে উঠে বাবা, জ্বরে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে ইতির। বাবা তাড়াহুড়া করে পট্টি লাগিয়ে দেয়। একটু জ্বর কমছে, বাবাকে তার বন্ধু বান্ধব ডাকছে, আর বলছে সময় নেই তাড়াতাড়ি চল অনেক রাত হয়েছে। বাবার মন্টা চাইছিলো না যেতে। না গেলেও তো হবেনা । বাবা গুটি গুটি পায়ে বাহিরে আসলো,এবং দাদীকে বললো, ইতির দিকে খেয়াল রাখতে। সবাই জেনে গেলো ইতির জ্বর। তাই কেউ আর বললো না ইতিকে সঙ্গে নিতে। বাবা চলে গেলেন ইতির নতুন মাকে আনতে।
এদিকে ইতি ভাসছে স্বপ্নের সাগরে। স্বপ্নে ইতির মা এসেছে ইতির কাছে। ইতি মায়ের কোলে শুয়ে আছে, ইতি মাকে বলছে, মাগো এতোদিন পর তোমার আসার সময় হলো বুঝি ? মা মুচকি হেসে বললো, হ্যাঁ । তবে আমি তোমার মধ্যে সব সময় বাস করি। তোমার মাথায় হাত দিয়ে রোজ রাতে আদর করি। ইতি আজ তোমার নতুন মা আসছে, আজ থেকে সেই তোমাকে অনেক আদর করবে, ভালোবাসবে। আমি অনেক দিন পরপর আসবো সেই চাঁদের দেশ থেকে তোমাকে দেখতে আদর করতে। ইতি মাকে বলে, মাগো কেন এমন লুকোচুরি ? মায়ের মুখে কোন উত্তর নেই। মা ইতিকে বললো, মা ইতি তুমি আমার কোলে ঘুমিয়ে যাও,আমি আদর করি তুমি ঘুমাও। ইতি মায়ের কোলে নিচিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে।

বাবা নতুন মাকে নিয়ে এসেছে। বাবা মাকে পথেই সব বলেছে ইতির সমন্ধে। মা এসেই বাবাকে বলে মেয়ে টাকে কিছু খাওয়াতে হবে। দাদী একটা প্লেটে ভাত আর তরকারী দেয় ইতিকে খাওয়ানোর জন্য। বাবা মাকে দেখিয়ে দেয় ইতির রুম। মা একাই যায় ইতির রুমে। এবং চমকে উঠে , চাঁদের মত ইতির চেহারা দেখে, এ যেন ইতি নয় হাড়িয়ে যাওয়া তার মেয়ে পুতুুল । মা ইতির পাশে বসে কল্পনা করছে সেইদিনের সড়ক দূর্ঘটনার কথা। (সেইদিন তার স্বামী আর মেয়ে পুতুল, জুমারবাড়ী বাজার থেকে গাইবান্ধা যেতেই সাঘাটায় সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়)। মায়ের চোখ দুটির পানি টপটপ করে পড়ছে ইতির মুখে। ইতি জাগিয়ে উঠে। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অবাক দৃষ্টিতে। মা বললো, মা ইতি আমি তোমার নতুন সৎ মা। ইতির চোখ টলমল করছে। বাবা দরজার আড়াল থেকে দেখছে। ইতি বললো, মা-গো চাঁদের দেশ থেকে আসার এই তোমার সময় হলো ? মা বুঝতে আর বাকী রইলো, ইতিকে কি বলে শান্তনা দেওয়া হয়েছিলো। মা হ্যাঁ বলবে নাকী না বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। ( মা জানেন শিশুদের সামনে মিথ্যা বলা বা মিথ্যা শান্তনা দেওয়া দুই পাপ। ) তাই মা মুচকি হেসে বললো, মা তুমি সারাদিন কিছুই খাওনি, তুমি ভাত খাও, তাহলে জ্বর কমে যাবে, আমি তোমাকে সুন্দর একটা গল্প শুনাবো। আনন্দে ইতির মুখ চোখ যেন আলোকিত হলো। এবং বললো, মা সত্যি বলছো ? মা তুমি আমাকে নিজের হাতে খাওয়াবে ? দেখো মা আমার আর জ্বর নেই। মা বললো, হ্যাঁ। ইতি বললো, জানো মা আমি শুধু দুর থেকে দেখতাম, রাকিব আর জান্নাতিকে যখন ওর মা নিজের হাতে খাওয়াতো। মা নিজেই মা হারা তাই খুব সহজে ইতির মনের কথা বুঝেছে নিশ্চয়। মা ইতিকে খাওয়াচ্ছে, ইতি খাচ্ছে আর কাঁদচ্ছে। মা বললো, ইতি কাঁদছো কেন মা ? ইতি বললো, মাগো আমি এর আগে এর চেয়ে অনেক দামী দামী খাবার খেয়েছি, মাগো এতো মজা কখনো পাইনি। মা আজ আমি আনন্দে কাঁদছি, মা। মা চোখে পানি রাখতে পারলেন না। মা ইতিকে বুকে জড়িয়ে নেয় আদর করে। ইতি মাকে বলে রাসেলের কথাগুলো। মা বলে,তোমার রাসেল ভাইয়া কোন সত্য ঘটনা দেখেছে তাই বলেছে। সবাই তো এক নয় মা। ইতি, চোখের পানিতে ভিজা মুখে একটা হাসি দিয়ে মাকে জড়িয়ে বলে আজ থেকে তুমি আমার ভালো মা।

Check Also

জেড এম জামিল উদ্দিন রাহেল এর কবিতা ‘নীল ক্লেশ ‘

অনন্ত সুখে স্বর্গে বাস দেহাবশেষ জুড়ে দেবীময় মন হে কল্পনার তীর্থ নারী কী বা দিয়েছো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + 7 =