সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / রঞ্জন এবং সকালবেলার গল্প—ড. আজাদুর রহমান

রঞ্জন এবং সকালবেলার গল্প—ড. আজাদুর রহমান

লাগাতার জলতরঙ্গ তুলে মোবাইলটা বেজেই চলেছে । আবছা একটা অনুমান হচ্ছে বটে কিন্তু ঘোরের কুয়ো থেকে রঞ্জন ঠিক উঠতে পারছেনা। ভোরবেলার ঘুমটা সত্যিই গাঢ় মধুর মত। বাচ্চাকাচ্চা হবার পর ঘুমের প্যাটার্ন বদলে
গেছে। সন্ধ্যের পরে সামান্য ঝিমুনি ভাব এলেও রাত বাড়ার সাথে সাথে চোখ থেকে ঘুম উড়ে যায়। তাছাড়া প্রস্রাবের চাপ বেড়েছে ইদানিং। গড়ে দু‘বার উঠতে হয়। দুটোর পর শরীরটা ভারি হতে থাকে। বাড়তে বাড়তে ভোরের দিকে গরদের পর্দা টেনে ঘুম নেমে আসে। খাসা শরীরে তখন আর কোন জোর-বল বা বোধ-বালাই থাকে না। মাতালের মত ঘুমায় রঞ্জন। এই মাখন সময়টুকুন অন্ততঃ কোন ডিস্টার্ব সহ্য করার মত নয়। তাছাড়া সপ্তাহের একমাত্র রবিবারেই সে কেবল মর্জিমত পড়ে থাকতে পারে। ব্যবসা বন্ধ থাকে। অঞ্চলে কাঠের ব্যবসায় এটি এক অলিখিত অফ ডে। রবিবার যে দোকান বন্ধ থাকবে একথা খদ্দেররাও মনে মনে জানে। এতদিনে বউও বুঝে গেছে-আর যাই হোক রবিবার সকালে রঞ্জনকে জাগানো যাবেনা। ফোনটা শোবার আগে সাধারণত অফ করে রাখে রঞ্জন। কিন্তু গতরাতে ব্যাপারটা মাথাতেই ছিল না। কত আর সহ্য করা যায়!

এক নাগারে বেজেই চলেছে। তন্দ্রার মধ্যেই রঞ্জেেনর মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিছু লোকের কান্ডজ্ঞান নেই বললেই চলে। ফোন না ধরলে তো বোঝা উচিত যে, যাকে ফোন করা হচ্ছে সে কোন কারণে হয়ত বিজি আছে-এই সাদা সত্যটাকে উপলব্ধি করা তো দুরের কথা, উল্টো নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবেনা, জিকির তুলে কল করতে থাকবে। কলের টানে মনে হবে-কী -না-কী জরুরী বিষয়, কিন্তু ফোন ধরলে দেখা যাবে, ফালতু ব্যাপার। আলোস্য এমনভাবে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ফেনিয়ে উঠেছে যে, ফোনটা ধরার মত সচেতন হতে পারল না রঞ্জন। তন্দ্রা রঞ্জন এবং সকালবেলার গল্প না কাটিয়ে সে পাশ ফিরল। কিন্তু জাহাবাজ ফোন থামছেনা। অগত্যা তুমুল বিরক্ত সমেত সে হাতের উপর ভর দিয়ে উঠতে চেষ্টা করল। ক্লেদাক্ত জমানো ওর মুখ- চোখই বলে দিচ্ছে-শালার ফোন-কারীকে কাঁচা খেয়ে ফেলতে পারলে মনের জ্বালা মিটত। রিসিভ করে কিছু বলতে হল না, ওপাশ থেকে হলহলিয়ে বলে যেতে থাকল- হ্যালো রঞ্জন ভাই আপনাকে তো পাওয়াই যাচ্ছে না! সকাল থেকে ফোন করেই যাচ্ছি! রঞ্জন রাগটা গলার তলে চেপে রেখে জর্জরিত কন্ঠে কেবল বলল- কে, আপনে! রঞ্জনের কথায় যেন চোট পেল লোকটা-আরে ভাই; আমি বেলাল, চিনতে পারছেন না! ওই যে বাবুরহাটে একবার দেখা হল, চা খেলাম, মনে নেই! রঞ্জন ঠিক চিনতে পারল না, মাথার ভিতর এলোমেলো কয়েকটা ছবি ঘুরে গেলেও বেলালকে সে ঠিক ছবি করতে পারল না। ভদ্রতার খাতিরে সে কেবল গাঁইগুঁই করে দু-একটা শব্দ বলতে পারল-ও, তো কী মনে করে সকালবেলা! বেলাল এবার কথার মেশিন ছেড়ে দিল-ভাই আপনে ভালো আছেন, ভাবলাম অনেকদিন কোন খোঁজখবর নেই তাই আর কী, ফোন করলাম, ভাবি বাচ্চারা সব ভালো, তারপর ব্যবসার খবর টবর কী….। রঞ্জন সামান্যে শেষ করতে চাইল-জ্বী ভালো। কিন্তু বেলাল ছাড়ছে না-আজ ভাই মনটা খুব ভালো, এক গাছে পনের’শ লাভ হয়েছে। সকাল বেলা গরম ভাতের মত ব্যবস্থা, হে হে হে…। রঞ্জন আর সহ্য করতে পারল না।
অফ বাটনে জোরে একটা টিপ দিয়ে গলার তলায় চেপে রাখা গালিটাকে বের করে দিল-শালা..চুতিয়ার পুত খাজুরে আলাপের আর সময় পেলে না। তেতো মন নিয়ে রঞ্জন শুয়েই থাকল। এই মুহুর্তে মনটা চাচ্ছে একটা শান্তিময় লম্বা ঘুম, অথচ উপায় নাই। শরীরকে ঢিল দিলে যা হয়, আপনিতেই ডালপালা মেলে আহলাদি হয়ে যায়। বন্ধ চোখে নতুন করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে থাকল রঞ্জন। বেশিক্ষণ লাগল না। ফিনফিনে একটা তন্দ্রাভাব আচ্ছন্ন করে ফেলল ওকে। তন্দ্রার একটা আলাদা মজা আছে, এও একটা নেশা, ঘুম-অঘুমের মধ্যে অলস সুতোর মাদকতা। সুতোটাকে সে অবশ্য বেশিদুর নিতে পারল না। কেটে গেল। তন্দ্রা কেটে কেটে রমেলার গলা ভাসছে। জেগে ওঠার পর সে মায়ের গলাও শুনতে পেল। সপ্তাহে একবার হলেও সংসারে ঝগড়া লাগে। ঠিক কোন দিন লাগবে তা বলা মুস্কিল, তবে সপ্তাহ মিস যায় না-এই হল কথা। রুটিন হয়ে গেছে। বাবা মরার পর থেকে ঝগড়ার পরিমাণ বেড়েছে। বাবা বেঁচে থাকতে একটা ঝাপসা অবস্থা ছিল। মা এখন পরিস্কার বুঝে নিয়েছেন যে, ছেলে পুরোপুরি পর হয়ে গেছে। পর হয়ে গেলেও আপত্তি ছিল না কিন্তু ছেলে বউয়ের কথা মত উঠ-বস করে। এক কথায় বউয়ের ভাউরা (ভেরুয়া) হয়ে গেছে।
রঞ্জন প্রথম দিকে ঝগড়ার ভিতরে ঢুকে যেত,খামোখা ঝড় থামাবার চেষ্টা করত। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হয়। দলাদলি বেড়ে যায়। একসময় ঝগড়ার তীর তার দিকে ছুটে আসে। দু‘জনই সাক্ষী মানতে শুরু করে তাকে। ফলে বিনাকারণে রাজসাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় রঞ্জনকে । কারও পক্ষে সাফাই করলেই শেষ। অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে চলে যাবে। রমেলা এমনিতেই ঠান্ডা মেয়ে, সংসারী-পরিশ্রমী কিন্তু জো উঠলে আর থামানো যাবেনা। সংসারের সবকিছুতে তখন লাগাতার হরতাল শুরু হয়ে যাবে। রমেলাকে শান্ত করার একমাত্র উপায় হল-সময় ক্ষেপন। ঘন্টাকয়েক পর হাসি মুখে কিছু প্রসংশা করতে পারলেই ও পানি হয়ে যাবে। কাজের প্রসংশা করলে সে পায়ে তেল মাখতেই দ্বিধা করে না। রঞ্জনের আফসোস-মা যদি রমেলাকে বুদ্ধি করে একটু কথায় খুশি রাখতে পারত, আহ্; সংসারের চেহারাটাই পাল্টে যেত। সংসার হ্যাক হবার ভয়ে সে আর তাই নিজ থেকে কোন কিছুর মধ্যে ঢুকে পড়ে না। উল্টো যেসব কথাবার্তা আগে শুনলে মাথা গরম হয়ে যেত সেসব শুনেও না শোনার ভান করে পড়ে থাকে সে। কিন্তু আজকের ঝগড়াটা থামছে না। পই পই করে এগিয়ে চলেছে। রঞ্জন জানে খাণিক বাদেই কুটকচালির বলটা গড়াতে গড়াতে তার উপর এসে পড়বে। ঝামেলার বিড়াল কোলে ওঠার আগেই পালাতে হবে। আলোস্যর মদে যত নেশাই হোক রঞ্জনকে এবার বিছানা ছাড়তে হবে। অনেকটা তাই ধুরমুড় করে খাট থেকে নেমে পড়ল সে। দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে ফেলল। তারপর যেন ট্রেন ফেল করবে এমন তাড়াহুড়োয় আঙিনা পার হতে গিয়ে একটা হাঁক ছাড়ল-আমি গেলাম, জরুরী কাজ আছে, ফিরতে দেরি হবে। এ যেন এক অলিখিত ওজর। যাতে এ নিয়ে ফের জেরার মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য সংসারের নলেজে সদয় অবগতির জন্য কথাগুলো গুজে দিয়ে রাখা মাত্র।

রঞ্জনের গলা পেয়ে রমেলা হা হা করে উঠল-কই যাও, নাস্তা বানাচ্চি, নাস্তা খেয়ে বের হও। রঞ্জন অপেক্ষা করল না বরং বাতাসে অস্পষ্ট কিছু একটা ছুড়ে দিল-গাছ পাওয়া গেছে, সাধন গাছ নিয়ে বসে আছে-এই বলেই সে হন হন করে বাজারের রাস্তা ধরে এগুতে থাকল। সাধনের সাথে তিনমাস হল ব্যবসা শুরু করেছে সে। আগে লোকমান ছিল, হিসেবপত্র নিয়ে ঝামেলা হওয়াতে সে পিছটান দিয়েছে। তারপর থেকে সাধন। শেয়ারে গাছ কেনে। চেরাই-ফাড়াই করে জ্বালানি কাঠ বিক্রি করে। শুধু যে জ্বালানি হয় তা নয়, কাঠের ব্যাবসার লাভটা আসলে একটা গোমর। গাছের কোন কিছুই ফেলনা নয়। পাতা থেকে শুরু করে শিকড় পর্যন্ত প্রত্যেকটাঁ পার্টসের কাজ আছে, টাকা আছে। ভাগমত মিললে-তক্তা-চৌকাঠ-বাটামের কাঠও যেমন পাওয়া যায়, জ্বালানিও তেমন। দেখা গেল যে কাঠ বেঁচেই টাকা উঠে গেল, বাদবাকী জ্বালানির সবই লাভ। কোন কোন সময় তো জায়গাতেই লাভ হয়ে যায়। খালি ম্যানেজমেন্ট করলেই হল। এক হাতে কিনে অন্যহাতে লাভে বিক্রি। লোকজন অবশ্য অতশত জানতেও পায়না। মোটাচোখে তাঁরা জা¡লানি ছাড়া কিছুই দেখেনা।
কিন্তু রঞ্জনরা গাছে হাত দিয়েই ভেদ-পরিচয় জানতে পারে। কাঠের ব্যবসার ঐটাই হল শিক্ষা-দীক্ষা। বউকে বোঝানোর জন্য সাধনের ব্যাপারটা মিথ্যে করে বলতে হলমাত্র। হাঁটতে হাঁটতে রঞ্জন ঠিক করল, আজ আর সাধনের কাছে গিয়ে লাভ নেই। ও ব্যাটাকে পাওয়া যাবে না। রবিবারে ও যে কোথায় যায় কেউ বলতে পারবেনা। ইদানিং সে নাকি গুরু ধরেছে। ফাঁক পেলেই গুরুর কাছে চলে যায়। গান-গাঞ্জা সব-ই চলে পুরোদমে। ব্যাটা করবেই বা কী! বাড়িতে গেলেই অশান্তি। বউ যখন একটা ছিল তখন কোন সমস্যা হত না। বউ দু‘টো হবার পর থেকেই চুলোচুলি। বাড়িতে ঢোকা মাত্র দুই বউ গলা বাড়িয়ে অভিযোগ নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে সাধনের ওপর। থামানো তো দুরের কথা, নিজেই চড়-থাপ্পরের মধ্যে পড়ে যায়। বেচারার শান্তি নেই। এখন চুল ছেঁড়ে আর আকাশে বাতাসে হাহাকার করে-কেন যে দুই বিয়ে করতে গেলাম, আহ্! ব্যবসাটাই মূলতঃ সাধনকে সর্বনাশ করল। একবার কাঠ নিয়ে চিটাগাং গেছিল। সেখানে কেমন কেমন করে যেন এক ফার্নিচারের দোকানির বিধবা বোনের সাথে প্রেম হয়ে গেল। শেষমেষ তিনমাস পরে বউ নিয়ে বাড়ি ফিরল। আর যায় কোথায়, প্রম বউ তিনদিন পরে বিষ খেল। জমে-মানুষে-গোবরে টানাটানি। সমানে গোবর গিলিয়ে বমি করিয়ে বউটারে ফেরানো হল। সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা! উটকো গুরু ধরার ব্যাপারে সাধনকে রঞ্জন ঠিক দোষায় না। দিশাকুল না পেয়ে শান্তির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে সে গুরু ধরেছে। সাধনকে অবশ্য দুনিয়ার কেউ বলার নেই। বলে লাভও নেই। ও একটা পরিবেশ তৈরি করে ফেলেছে। সংসারে পরিবেশটা তৈরিটাই বড় কথা। কাউকে যদি ঠাটে-বাটে-কর্মে-কাজে ভালোভাবে ধাতটা বুঝিয়ে দেয়া যায় তাহলে এনিয়ে প্রম দিকে কেরিক্যাচারি থাকলেও পরে আর সমস্যা হয় না। রঞ্জন সোজা মতিপুর হাটে চলে গেল। বেশি দুরে নয়। সামান্য পথ। ভ্যানের খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে বাজার চলে আসে। সেকারণে বেশিরভাগ সময় সে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাটতে শুরু করে। সিগারেট শেষ হতে হতে বাজারের গলি পায় সে। বাজারের সুবিধা হল সেখানে সাংসারিক বিষয়-আশয় নাই। আছে আড্ডা, চা সিগারেট, আজাইরা আলাপ-সালাপ আর রাজনীতি। রঞ্জনের আরও একটা বাড়তি আকর্ষণ আছে, তা হল ক্ষিতিশের দোকানের পরাটা। ও ব্যাটা সোডা মেশানো খামির করা ময়দার সাথে চুপচুপা তেল মেখে পেঁচিয়ে পুঁচিয়ে সাড়ে পাঁচ প্যাঁচ তুলে সিংগারারা মত করে পরটা ডলে। ওই পরাটা তেলে ছাড়া মাত্র ফুলে ওঠে। ভিতর বাহির পুরোপুরি সেদ্ধ। যেমন মৃদু মচমচে তেমন আরামদায়ক
সুস্বাদু। গরম গরম পরাটা, সাথে আলু বা বুটের ডাল-আহ্ কী যে টেস্ট লাগে, বলার না। তৃপ্তির শেষ নাই। পরাটার পর গাঁইয়ের গাওয়া দুধে বেশি চিনির কড়া লিকারে চা। রঞ্জন এক বসাতে দুই কাপ খেয়ে তবে সিগারেট ধরায়। ক্ষিতিশের পরাটার ছবিটা মনে করে সে দ্রুত হেঁটে যায় তারপর মাছের বাজার পেরিয়ে রমারম হোটেলে ঢুকে পড়ে। চেয়ার টেনে বসার আগেই সাধন হাঁক দিল-এঁই এদিক আয়। সাধন তো আজ এখানে আসার কথা নয়! তাছাড়া সে হরদম হোটেলে আসেও না। রঞ্জন কিছুটা আশ্চর্য্যমুখে সাধনের মুখোমুখি বসতে বসতে বলল-কী রে তুই সকালবেলা, এখানে! দরবারে যাস্ নি। সাধন কোন জবাব দিল না। মাথা নিচু করে চায়ে চুমুক দিল। এক মুখে থাকতে গিয়ে রঞ্জন কিছুটা বিরক্ত হল-কী রে কথা বলছিস না কেন? রঞ্জনের দমকে সাধন যেন হুশ খুঁজে পেল। কাপটা কাঁপা কাঁপা হাতে রাখতে গিয়ে ফেলে দিল। চা ছড়িয়ে পড়ল টেবিলে। রঞ্জন এবার ভালো করে ওর মুখটা দেখতে পেল। চোখদুটো যারপর নাই লাল হয়েছে। ধুলো মেশানো মাথার চুল উস্কো খুস্কো। সিগারেট ধরাতে গিয়ে লক্ষ্য করল সাধনের হাতগুলো বেশ কাঁপছে। রঞ্জন বেশ জোরেশোরেই গলা বাড়াল-কী রে, কী সমস্যা তোর। সাধন শক্তমুখেই উঠে পড়ল। তারপর বলল, দাঁড়া আমি বাইর থেকে আসতেছি। কিছু বলা-বোঝার আগেই সে হন হন করে বের হয়ে গেল। সাধন চলে যাবার পরক্ষনই হোটেল জুড়ে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। দু’জন অন্য টেবিল থেকে রঞ্জনকে যা বলল, তাতে ওর কান গরম হয়ে গেল। সাধনের প্রথম স্ত্রী মার্ডার হয়েছে। ঝগড়ার জের ধরে সে আত্মহত্যা করেছে- সাধনের এমন গা বাঁচানো কথায় কেউ গা করেনি। ভিকটিমের গলায় যেমন ফাঁস লাগানো আছে তেমন সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে। তাছাড়া সাধনের গায়েও বেশকিছু আঁচড় পাওয়া গেছে। সন্দেহের তীর ছোটার সাথে সাথে সাথে ব্যাপারটা সাতসকালেই রাস্ট্র হয়ে গেছে। সাধনের শ্বশুর ইতিমধ্যেই এলাকার দেওয়ানা-মাতবরদের দিয়ে থানায় মামলা করেছে। ঘটঁনা এ পর্যন্ত হলে তেমন অসুবিধা ছিল না। কিন্তু রঞ্জনকে দুই নং আসামি করা হয়েছে। কারণ হিসেবে যা অভিযোগে এসেছে তাহল, গতকাল অনেকরাত পর্যন্ত সাধন রঞ্জনের সাথেই ছিল এবং রঞ্জন যে সাধনের বাড়ি পর্যন্ত এসে গাছের তলে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অনেক্ষণ আলাপ-সালাপ করেছিল-তাও নাকি পুলিশরা জেরা করে বের করেছে। সাধনের শ্বশুড়পক্ষের আপাততঃ ধারনা-রঞ্জনের যোগসাজসেই এই মার্ডার হয়েছে। রঞ্জনকে চাপলেই সব ঘটনা পরিস্কার হয়ে যাবে। একথা ঠিক যে, রঞ্জন ছাড়া আর কারও সাথে সাধনের ঘনিষ্টনা নেই। তাই বলে খুনের আসামি হতে হবে! রঞ্জন ঠিক ভেবে পাচ্ছেনা কেন তাকে আসামি করা হয়েছে। এলোমেলো আশংকা মাথায় করে মনে মনে পথ হাতড়াতে লাগল সে। ওদিকে যাচনা ছাড়াই এক বৃদ্ধ কানের কাছে নেমে এল-‘তুমি নাকি ওকে পরামর্শ দিয়েছিলে, কোন এক বউ না মরলে তোর সংসারে শান্তি আসবেনা। আর সে জন্যই নাকি সে বউকে ফাঁস দিয়ে মেরেছে‘। যতসব ফালতু কথা, আমি বললাম আর সে বউকে মারল। মগের মুল্লুক নাকি-রঞ্জন খামোখাই বোধশূন্য হয়ে বৃদ্ধের উপর চেঁচিয়ে চলল। থামল না- সেকি নাবালক, নাকি আমার কথায় ওঠে বসে। আমি মরতে বললে সে মরবে নাকি! বৃদ্ধ আর কথা বাড়াল না, আলগোেছ নিজের সিটে গিয়ে বসল। অন্যসময় হলে হয়ত বৃদ্ধটিও খেকিয়ে উঠে ভাগমত জবাব দিয়ে দিত। কিন্তু এখন কথা বাড়ালেই জড়িয়ে যেতে হবে। অল্প সময়েই জনা বিশেক লোক জমা হয়ে গেছে। সবার চোখেমুখেই থমথমে ভাব। হোটেলের ভিতরহালকা গুঞ্জন তুলে চোরাচোখে রঞ্জনের দিকে তাকাচ্ছে তাঁরা। রঞ্জন এই মুহুর্তে এতগুলো চোখের মুখে নিজকে ঠিক সামাল দিতে পারছে না। হোটেল থেকে বের হয়ে আসতে চাইল সে। কিন্তু তার আর সময় পেল না। দারোগা সাহেব তিন চারজন সেপাই নিয়ে দমাদম হোটেলে ঢুকে গেল। রঞ্জন কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু তার আগেই বিশাল এক চড় পড়ল ওর গালে। দুনিয়াদারি করতে করতে পুলিশকে রঞ্জন এতদিনে ঠিক চিনে ফেলেছে। কথা বাড়ানো মানে ফের মার খাওয়া। মাথা তোলার আর মানেই হয় না। তবুও একবার চোখ তুলে চারদিকে দেখতে চাইল কেবল। প্রত্যেকেই একটা আজন্ম কৌতুহল নিয়ে নিরবে চেয়ে আছে তাঁর দিকে। সকলের চোখে মুখেই ভয়ের ছাপ। কেউ টু শব্দটি করবার জো রাখছেনা। রঞ্জন জানে এরা কেন, তার পক্ষে আগ বাড়িয়েসাপোর্ট করার মত কেউ নেই তার। বাবা বেঁচে থাকলে তবুও একটা কথা ছিল। যে করেই হোক বাবা এসে মাথায় ছাতা তুলে দিত। কিন্তু আজ কেউ আর নেই আসার মত। পুলিশের হাতে পড়ে লজ্জা-অপমানে আজ বড় বেশি ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে তাঁর। শেষমেশ রমেলার মুখটাই বড় হয়ে ভাসতে লাগল রঞ্জনের বুকজুড়ে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেনে গেছে ও। থানায় যাবার আগে রমেলার সাথে অন্তত দেখাটা হলে ভাল হত। রমেলা হয়ত এতক্ষণে খবর পেয়ে রওনাও দিয়েছে।

রঞ্জন মনে মনে অপেক্ষা করতে লাগল। আর কিছুক্ষণ দেরি হলে ওর সাথে দেখাটা হতেও পারত। পুলিশ দেরি করল না। দৌড়ের উপর ওকে ভ্যানে তুলে নিল। তারপর ধুলো উড়িয়ে ভ্যান ছুটে চলল থানার দিকে।

(ড.আজাদুর রহমান- কবি, গল্পকার, বিজ্ঞানী,লালন গবেষক)

Check Also

সোনাতলায় দুর্জয় সাহিত্য গোষ্ঠীর ২ যুগ পূর্তি উৎসবের উদ্বোধন

আব্দুর রাজ্জাক, স্টাফ রিপোর্টারঃ সোনাতলায় দুর্জয় সাহিত্য গোষ্ঠীর ২ যুগ পূর্তি উৎসবের উদ্বোধন করা হয়েছে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − 6 =