সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / ফিচার সংবাদ / লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এর প্রেক্ষাপট ও জীববৈচিত্র্য – রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এর প্রেক্ষাপট ও জীববৈচিত্র্য – রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস

সরকার জীববৈচিত্র্য মূল্য বিচার করে ১৯৯৬ সালে পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ২৭.৪ বর্গ কিলোমিটারের প্রায় অর্ধেকটা, মানে ১২.৫ বর্গকিলোমিচার, জায়গাকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। এটি হয়ে ওঠে সারাদেশের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী দর্শনের এক প্রসিদ্ধ স্থান।
সঠিক তথ্যনির্ভর নয়-এমন সব সস্তা লেখালেখির ফলে জনমনে এমন বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে, লাউয়াছড়া তথা পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন একটি প্রাকৃতিক বন। আসলে বর্তমান বাংলাদেশের কোথাও এক খস্ত বন নেই-যাকে আদি প্রাকৃতিক বন মানে ভার্জিন বন বলা যাবে। বা যে বনে বনবিভাগের হস্তক্ষেপে প্রাকৃতিক বন কেটে সেখানে তাদের পরিকল্পিত বা পছন্দের অথবা বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া যায় এমন দেশি ও বিদেশি গাছের প্রজাতি না লাগানো হয়েছে বা বনে বাস করা আদি জনগোষ্ঠীর জুমচাষের শিকার হয়ে বন ধ্বংস হয়নি। বাংলাদেশ তথা সারা ভারতবর্ষে বন ধ্বংসের গোড়াপত্তন করে ব্রিটিশরা।
১৮৬৪ সালে প্রথম বন বিভাগের সৃষ্টি হয়। তখন এর প্রধান ছিলেন ব্রান্ডিস। এরপর ১৮৭২ সালে শিক বন সংরক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং তাঁর সময়ে অবিভক্ত বাংলার বনকে ৫টি বন বিভাগে বিভক্ত করা হয়। এর একটি ছিল ঢাকা বিভাগ-যার অধীনে আসে সিলেট এবং কাছার অঞ্চল। আসাম ফরেস্ট রেগুলেশন ১৮৭৫-৭৬ সালের  বরাতে সিলেটের বনকে প্রথমে ‘সংরক্ষিত বন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যতদূর জানা যায়, সি পুরাকায়স্থ নামের একজন সিলেট অঞ্চলের ১৯৩৫ -৩৮ সালের  জন্য একটি ‘প্ল্যান্টেশন স্কীম’ তৈরী করেন। ১৯৩৮ সালে সিলেট বন বিভাগের জন্য এন এন দাশ নামের একজন বন কর্মকর্তা ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৭ সালের জন্য একটি ওয়ার্কিংপ্লান তৈরি করেন। আর সেই ১৯৩৫ সাল থেকে নানান পরিকল্পনার নামে সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক বন কেটে সেখানে ব্রিটিশরা চাহিদা পূরণের জন্য নতুন বন সৃজন করা হয়। সম্ভবত ১৯৫৯ সালে ভানুগাছের বন সর্বশেষ পাইকারিভাবে কেটে সেখানে নতুন গাছ লাগানো হয়। যে কোন কারনেই হোক এ যাবৎ পর্যন্ত ঐ বনের গাছ ব্রিটিশের চালু করা ‘ক্লিয়ারফেলিং’ বা মাটিবাদে বাকি সব গাছ কেটে সাবাড় করে সেখানে পছন্দ ও প্রয়োজনের জন্য বাণিজ্যিক বন সৃজন করা হয়নি। ফলে লাউয়াছড়ায় বহু প্রাকৃতিক এবং স্থানীয় উদ্ভিদের প্রজাতির পুনর্জন্ম হয়েছে এবং বনটিকে দেখতে প্রায় প্রাকৃতিক বনের মতো লাগে।
এবার মানচিত্রে লাউয়াছড়ার ওপরে আসুন। ভানুগাছ বাদে বাকি সব জায়গা জুড়ে হয় জনবসতি, ফসলি জমি নয়তো চা বাগান। অর্থাৎ ১৯৩৫ থেকে কম করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এ এলাকার তাবৎ বন কেটে বা দখল করে সেখানে উঠেছে মানুষের বাসস্থান। মানচিত্রের গভীরে বা লাউয়াছড়ার মাঝখান দিয়ে হাঁটলে দেখা যাবে আদিবাসীদের ‘অধিকারের অংশ হিসেবে বনের গাছ কেটে বা ছেঁটে খাসিয়া ও ত্রিপুরিদের পছন্দ ও প্রয়োজনের তাগিদে কিছু গাছ রেখেছে পান চাষের জন্য। বাকি বন উজাড় করা হয়েছে। আশেপাশের বাঙালিরাও দখল করতে কম যায়নি। এসব বারোয়ারি চাপের মুখে উজাড় হয়ে যাওয়া বনের বা প্রাকৃতিক জঙ্গল ঝোপঝাড়ের বেশিরভাগ প্রাণী আশ্রয় নিয়েছে লাউয়াছড়ায়। প্রাণী জগতের নিচের দিক থেকে ধরলে এ বনে সবচেয়ে বেশি আছে কেঁচো ও তদজাতীয় প্রাণী, শামুক এবং খোলসহীন শামুক বা শ্লাগ, অসংখ্য ধরনের পিঁপড়ে, প্রজাপতি, দেয়ালি পোকা বা মথ, ফড়িং, ঘাসফড়িং ফলং উড়চোঙ্গা, গোবরে, জোনাকি, গান্ধী ও ঝিঝি পোকা মাকড়সা, চেল্লা বিছা বা বিচ্ছু, কেন্নো, উইপোকা, মিঠাপানি ও ভূমি কাঁকড়া। তার সঙ্গে আছে মশা-মাছি। ঊনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দিতে ব্রিটিশামলের দেশি ও বিলেতি বিজ্ঞানীরা বেশকিছু অমেরুদন্ডী প্রাণীর আদি প্রজাতি নমুনা সংগ্রহ করে সিলেট জেলা তথা শ্রীমঙ্গল থেকে।  ১৯০০ সালে ভারতকেন্দ্রিক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পোকক সিলেটের শমসের নগর থেকে পাওয়া নমুনার ওপর ভিত্তি করে ছুরি বিচ্ছু বা হুইপ স্করপিয়নটির (Hypoctonus oatesii) নামকরণ ও প্রজাতি স্থাপন করেন।
লাউয়াছড়াকে বলা যায় পাখির জন্য বাংলাদেশের স্বর্গরাজ্য। এখানে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। বৃহত্তর সিলেট জেলা বা সিলেট বন বিভাগ; ৩টি পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার যে মিশ্র চিরসবুজ ও ক্ষয়িষ্ণু বন সেখানে। এর মধ্যে কেবল লাউয়াছড়াতেই আছে ৫৭টি (তথ্য: বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট)। এটি দেশের উল্লুকদের সবচেয়ে বড় দল-যা মোট ১৪টি ছোট ছোট উপদলে এবং প্রতিটি দল আলাদাভাবে বনের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করে। এর মধ্যে ৩ থেকে ৫টির একটি দল থাকে লাউয়াছড়া বন বিভাগীয় বাংলোর আশেপাশে যা পর্যটকরা সচরাচর দেখে থাকেন। অল্প বা প্রায় বিনা পরিশ্রমে উল্লুক দেখার জন্য মোক্ষম জায়গা দেশে খুব কম আছে।
উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদ প্রজাতিঃ চাপালিশ, লটকন, আগর, পিতরাজ, কদম, ছাতিয়ান, কড়ই, শিমুল, চিকরাশি, হারগজা, জলপাই, নাগেশ্বর, ডুমুর, বট, অশ্বথ, আওয়াল, গামার, চালমুগড়া, জারুল, রকত নতা, চম্পাফুল, উদল, আমলকি, হরিতকি, বহেরা, জাম, অর্জুন, সেগুন, বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড, বাঁশ ও বেত ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য বন্যপ্রাণীঃ উল্লুক, লজ্জাবতি বানর, হনুমান, বন বিড়াল,শুকুর, ভাল্লুক, বাঘডাস, মেছোবাঘ, বেজি, শিয়াল, মায়া হরিণ, খরগোশ, কোকিল, মুখ পোড়া হনুমান, টিয়া, ময়না, কাঠবিড়ালী, মাছরাঙা, সজারু, লাউঠগা, অজগর, দারাশ, দুধরাজ কালনাগীন, বিভিন্ন প্রজাতির ব্যঙ, বনমোরগ ইত্যাদি।
এক কথায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও তার পাশে যে সামান্য বন এখনো দাঁড়িয়ে আছে, তা যে আমাদের দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি স্বর্ণখনি তা বলাই বাহুল্য। ফলে এটিকে দেশের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের একটি অন্যতম নিদর্শন হিসেবে সর্বতোভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
লেখকঃ
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা
রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস

Check Also

সোনাতলার যমুনার চরে রাখালদের ঠোটে হারিয়ে যাওয়া বাঁশির সূরের মূর্ছনা

আব্দুর রাজ্জাক, স্টাফ রিপোর্টারঃ বাংলার চিরায়ত সবুজ মাঠে সোনালী অতিত রাখালের গরুরপাল, রাখালের বাঁশির সেই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + seventeen =