সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / ফিচার সংবাদ / শতভাগ নিঃস্বার্থ বনায়ন কর্মী গন্ধগোকুল  

শতভাগ নিঃস্বার্থ বনায়ন কর্মী গন্ধগোকুল  

গন্ধগোকুল ‘সাধারণ বা এশীয় তাল খাটাশ’, ‘ভোন্দর’, ‘নোঙর’,‘সাইরেল’ বা ‘গাছ খাটাশ’ নামে পরিচিত। তালের রস এদের প্রিয় বলে গ্রামাঞ্চলে এরা তাড়ি বা টডি বিড়াল নামেও পরিচিত।
ইংরেজি: Asian palm civet; বৈজ্ঞানিক নাম: Paradoxurus hermaphroditus
এরা মাঝারি আকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী। নাকের আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত ৯২-১১২ সেন্টিমিটার, এর মধ্যে লেজই ৪৪-৫৩ সেন্টিমিটার। লেজের দৈর্ঘ্য ৪৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আকার ৫৩ সেন্টিমিটার। ওজন ২.৪-৫.০ কেজি। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে গন্ধগ্রন্থি থাকে। গন্ধগোকুলের গাট্টাগোট্টা দেহটি স্থূল ও রুক্ষ বাদামি-ধূসর বা ধূসর-কালো লোমে আবৃত।
আবাস:
গন্ধগোকুল মূলত শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় অঞ্চলেই এরা বসবাস করে। অরণ্যের বদলে নিবিড় তৃণভূমি ও বন বাদাড়ই বেশি পছন্দ। গর্ত, পাথরের নিচে কিংবা উঁচু ঘাস ও ঝোপঝাড়ের তলায় থাকে। সুন্দরবন ও উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অঞ্চল ছাড়া আমাদের দেশের সর্বত্রই আছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, মায়নমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্পুচিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার জাভা, কালিম্যানতান, বইয়ান ও সিবেরাত এলাকায় স্থানীয়। ইরিয়ান জয়া, লেজার সুন্দ্রা দ্বীপপুঞ্জ, মালুকু, সুলাওজি এবং জাপানে এদের প্রাচীন আবাসস্থল। পাপুয়া নিউগিনিতে এদের উপস্থিতি তেমন চোখে পড়ে না।
স্বভাব :
গন্ধগোকুল সাধারণত নিশাচর প্রাণী। এদের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এরাই মানুষের বেশি কাছাকাছি থাকে। দিনের বেলা বড় কোনো গাছের ভূমি সমান্তরাল ডালে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকে, লেজটি ঝুলে থাকে নিচের দিকে। মূলত ফলখেকো হলেও কীটপতঙ্গ, শামুক, ডিম-বাচ্চা-পাখি, ছোট প্রাণী, তাল-খেজুরের রসও খায়। অন্য খাদ্যের অভাবে মুরগি-কবুতর ও ফল চুরি করে। এরা ইঁদুর ও ফল-ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। এদের অন্ধকারে অন্য প্রাণীর গায়ের গন্ধ শুঁকে চিনতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এরা পোলাও চালের মতো তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে থাকে।
প্রজননকাল
এদের নির্দিষ্ট কোন প্রজনন ঋতু নেই। বছরে যে কোনো সময়ে প্রতি ছয় মাস পর পর দুবার প্রজনন ও বাচ্চা প্রসব করে। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে গন্ধগ্রন্থির নিঃসরণের মাধ্যমে নিজেদের সীমানা নির্ধারণ করে। মূলত একাকী হলেও প্রজননের সময় স্ত্রী-পুরুষ একত্রে থাকে। গর্ভধারণকাল দুই মাসের কিছু বেশি। পুরোনো গাছের খোঁড়ল ছানা প্রসবের উপযুক্ত স্থান। কিন্তু খোঁড়লের অভাবে গাছের ডালার ফাঁকে, পরিত্যক্ত ঘর বা ইটের ভাটা, ধানের গোলা, তালগাছের আগায় ছানা প্রসবের পছন্দের জায়গা। প্রতিবার ছানা হয় তিনটি থেকে চারটি। ছানারা চোখ খোলে ১০-১২ দিনে। মা-গন্ধগোকুল দেহের সঙ্গে লেজ মিলিয়ে একটি বৃত্তের সৃষ্টি করে। ছানারা কখনোই বৃত্তের বাইরে যায় না। প্রায় ছয় মাস বয়সে ছানারা সাবালক হয়।
বেঁচে থাকার হুমকী সমূহ :
বর্তমানে গন্ধগোকুল  অরক্ষিত প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। পুরোনো গাছ, বন-জঙ্গল কমে যাওয়ায় এবং এদের আবাসভূমি ধ্বংস হওয়ায় দিন দিন এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এছাড়াও বন-জঙ্গল কমে যাওয়ায় এদের স্বাভাবিক খাদ্যহ্রাস পাওয়ায় মাঝে মাঝে ক্ষুধার তাড়নায় এরা জনবসতিতে গিয়ে গৃহস্থের হাঁস-মুরগি চুরি করে। হাঁস-মুরগি বাঁচানোর জন্য, স্থানীয় জনসাধারণ অজ্ঞতাবশত এদের হত্যা করছে এবং এই ব্যাপক নিধনের জন্যই এরা আজ বিপন্ন।
কবিরাজি চিকিৎসায় গন্ধগোকুলের তেলসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সমূহের প্রয়োজন হয় বিধায় এ প্রাণীটিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। অথচ গন্ধগোকুলের তেলসহ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গসমূহের উপকারিতার কোনো বৈজ্ঞানিক  ভিত্তি নেই। এছাড়াও এরা পোলাও চালের মতো তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে থাকে। এক সময় এর শরীরের গন্ধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রস সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে কৃত্রিম বিকল্প সুগন্ধি তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) বিবেচনায় পৃথিবীর বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় উঠে এসেছে এই প্রাণীটি।
বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।
শতভাগ নিঃস্বার্থ বনায়ন কর্মী গন্ধগোকুল:
বনায়ন ও পরিবেশ রক্ষায় গন্ধগোকুল অনেক বড় ভূমিকা রাখে। এরা মূলত  কৃষিক্ষেত্রের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, পোকামাকড় ও সেগুলির লার্ভা  খেয়ে আমাদের উপকার করে থাকে। গাছে উঠতে পারলেও মাটিতেই শিকার ধরে এবং ইঁদুর, কাঠবিড়ালী, ছোট পাখি, টিকটিকি, খেয়ে থাকে।
ফলমূল খেয়ে এর বীজ বিস্তারের মাধ্যমে বন বিস্তারের কাজটিও করে থাকে। বিশেষ করে তারা যখন  বট-পাকুড় বা এইধরণের ফল খায় তখন এর মলের দ্বারা নির্গত সেই বীজগুলোর সফল অঙ্কুরোদগম হয়ে উদ্ভিদে পরিণত হয়। অর্থাৎ এর পেটের ভেতর দিয়ে ফলের বীজগুলো সফলভাবে ‘জার্মিনেশন’ হলে পরবর্তীতের ঐ বীজের অঙ্কুরোদগম শতভাগ কার্যকরী হয়ে থাকে।
© মোঃ মামুন উল হাসান শাওন
নির্বাহী পরিচালক
সাস্টেইনেবল এনভায়রনমেন্টাল ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (এসইডিবি)
শৈলী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা।

Check Also

করোনার টিকা গ্রহণে রোজা ভাঙবে না

রমজানে টিকা গ্রহণে মানুষের উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে ব্রিটিশ ইসলামিক মেডিকেল গ্রুপগুলো জানিয়েছে যে, কোভিড-১৯ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 + 5 =