সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / ফিচার সংবাদ / শহীদ খোকন, সুফিয়ান, সাবু ও রউফের সহযোদ্ধা বীরমুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম–ইকবাল কবির লেমন

শহীদ খোকন, সুফিয়ান, সাবু ও রউফের সহযোদ্ধা বীরমুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম–ইকবাল কবির লেমন

অসম সাহসী এক বীর মুক্তিযোদ্ধা সোনাতলা উপজেলার তাজুল ইসলাম। সোনাতলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেনিতে অধ্যয়ণের সময় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের উদ্দীপনাময় ভাষণ তাকে সহ তার সহপাঠীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যেই স্থানীয় কামারপাড়ার আব্দুল জোব্বার এর নেতৃত্বে সোনাতলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ড্যামি রাইফেল নিয়ে ট্রেনিং শুরু করেন। এখানে সপ্তাহখানেক ট্রেনিং নেয় তাঁরা। ঠিক এ সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি দল রেলগাড়িতে করে গাইবান্ধার দিক হতে সোনাতলা রেল স্টেশনে এসে এলোপাতাড়ী গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে সোনাতলার কয়েকজন হতাহত হয়। বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাজিত করার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে তাজুল ইসলাম সোনাতলা থেকে বগুড়ায় গিয়ে সেন্ট্রাল স্কুলে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। এখানে তাঁর সাথে সোনাতলার আরও ৭/৮ জন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। এখানে ১২/১৫ দিন প্রশিক্ষণ করার পর বগুড়ায় আর্মি আসার কথা শুনতে পেরে তিনিসহ ২/৩ ট্রাক মুক্তিযোদ্ধা আর্মস্সহ বাঘাবাড়িতে অবস্থান নেন। ঢাকা থেকে আসা আর্মিরা বগুড়ায় না ঢুকে পাবনার দিকে গেলে তিনিসহ মুক্তিযোদ্ধারা আবার বগুড়ায় ফিরে আসেন। পরে রংপুরের দিক হতে আর্মিরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বগুড়ার দিকে অগ্রসর হলে ক্যাম্প থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেয়া হয়। তখন তিনি নিজবাড়ি সোনাতলায় ফিরে আসেন। বাড়িতে এসে তিনিসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভারতে প্রশিক্ষণ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারপর সোনাতলার নুরুল আনোয়ার বাদশা, সারওয়ার জাহান, সিরাজ আকন্দ,আলতাফ হোসেন বুলু, আব্দুর রউফ কালু, তবারক হোসেন সাবু, গাবতলীর আমিনুল ইসলাম পিন্টুসহ প্রায় ২০ জন শিবগঞ্জ উপজেলার গাংনগরে একত্রিত হয়। সেখান থেকে একসঙ্গে ঘোড়াঘাট হিলি হয়ে ভারতের বালুরঘাটে প্রবেশ করেন। ভারতের রায়গঞ্জে গিয়ে সোনাতলার জুলফিকার হায়দার বুলু ও মকবুল হোসেন এর সাথে যোগাযোগ করে ট্রানজিট ক্যাম্প কুরমাইলে ভর্তি হন। ওখান থেকে তাঁদের রায়গঞ্জে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণ শেষে উইং কমান্ডার মাজুল ইসলামের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের কানুপুর গ্রামে প্রবেশ করেন। তাদের সাথে গাইডের গুরু দায়িত্ব পালন করেন কাহালুর সুফিয়ান। কানুপুর গ্রামে অবস্থানের কথা থাকলেও আগের দিন আক্কেলপুরে আর্মিরা ক্যাম্প করার কারণে গাইড সুপিয়ানের পরামর্শে ৫/৬ জনের বেশ কয়েকটি টিমে বিভক্ত হয়ে গাইড সুফিয়ানের নেতৃত্বে আক্কেলপুর থানা সদরের দিকে অগ্রসর হন। মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলামের টিমের টিম লিডার ছিলেন খোকন পাইকাড়। আর তাজুল ইসলাম ছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট টিম লিডার। আক্কেলপুর সদরের কাছাকাছি পৌঁছার পর টিমগুলো পাটক্ষেতে অবস্থান নেন। এরপর আবারো টিমগুলো পৃথক হয়ে রেল লাইন ক্রস করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। কয়েকটি টিম সামনে এবং কয়েকটি টিম পিছে পড়ে যায়। প্রথম টিমের সদস্য হিসেবে তাজুল ইসলাম ও তাঁর সাথীরা নদীতে নৌকায় করে প্রায় অপর প্রান্তে পৌঁছে যান। পিছে পড়া দ্বিতীয় টিমটির সামনে টুপি পড়া ৫/৬ জন লোকের সামনাসামনি কথা হওয়ার সময় একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। এ টিমে ছিলেন শহীদ তবারক হোসেন সাবু ও শহীদ আব্দুর রউফ কালু। তাজুল ইসলামের প্রথম টিমের সদস্যরা নদী পার হয়ে পাটক্ষেতের পাশ দিয়ে সামনের দিকে যাওয়ার সময় পাটক্ষেত নিড়ানি দেওয়া কৃষকেরা মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকে। তাদের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ধাওয়া করে। কৃষকদের হইচই শুনে পাকিস্তানীদের সমর্থক গ্রামবাসী এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ধরে এবং শরীর তল্লাশী শুরু করে। তারা টিম লিডার খোকনের কাছে একটি গ্রেনেড পায়। তখন তারা খোকনকে মারতে ও বাঁধতে উদ্যত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাজুল ইসলাম একা পড়লে তিনিও তাদের অনুসরণ করে রওনা দেন। তাজুল ইসলামকে পাকিস্তানপন্থী কৃষকেরা ঘিরে ধরে বারবার পিঠে হাতাহাতি করছিলো। এ সময় তাজুল ইসলাম ব্যাগ থেকে গ্রেনেড বের করলে তারা পালিয়ে যায়। এ সুযোগে তাজুল ইসলাম পাটক্ষেতে অবস্থান নেয়। প্রায় আধঘন্টা পরে টিম লিডার খোকন ও গাইড সুফিয়ানকে ধরে নিয়ে গিয়ে গ্রামবাসী আর্মিদের খবর দেয়। খোকন ও সুফিয়ান তাদের আর্মির কাছে না দিয়ে একটি গর্ত খোড়ার কথা বলেন। তারা সেখানে আত্মহত্যার পর তাদের লাশ ওই গর্তে রাখার কথা বলেন। তাঁদের কোন কথা না শুনে পরে খোকন ও সুফিয়ানকে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাদের হত্যা করা হয়। জুলাই মাসে এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতিগত কারণে তেমন কোন প্রতিরোধ করতে না পেরে লুকিয়ে থেকে কয়েকদিন পরে তাজুল ইসলাম সোনাতলায় পিরে আসেন। বাড়িতে আসার ১ সপ্তাহ পরে পুনরায় মানকার চর হয়ে ভারতে বালুরঘাটে প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়ে আক্কেলপুরের ঘটনা বিস্তারিত জানান। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর তাজুল ইসলামকে টান্ডুয়াতে ফায়ার প্রশিক্ষণ করার জন্য পাঠানো হয়।এ সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন ফেরদৌস জামান মুকুল ও উইং কমান্ডার মাজুল ইসলাম।প্রশিক্ষণ শেষে ১০ ডিসেম্বরের দিকে পুনরায় হিলি বর্ডার হয়ে আক্কেলপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এর কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে।

Check Also

হোম কোয়ারেন্টাইনকে আনন্দময় করতে সাইবার একাত্তর এর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

সাজেদুর আবেদীন শান্ত, বাঙালি বার্তাঃ করোনার পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে আমাদের ঘরে থাকতে হবে। আবার ঘরে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 4 =