সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / সাঁওতাল পল্লীতে — এম এম মেহেরুল (প্রথম পর্ব)

সাঁওতাল পল্লীতে — এম এম মেহেরুল (প্রথম পর্ব)

সময়টা ২০০৭ সাল।তখন আমি সরকারি নাজির আখতার কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ১ম বর্ষের ছাত্র। কলেজের বার্ষিক বনভোজনে সেবার আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো দিনাজপুরের সিংড়া শাল বনে। ঠিক কবে গিয়েছিলাম দিন তারিখ মনে নেই।অবশ্য আমার পুরনো ডাইরি খুজে দেখলে সেটাও বের করা সম্ভব। কেননা ছোট থেকেই আমার একটা স্বভাব ছিলো যেখানেই বেড়াতে যাই না কেন সাথে একটা প্যাড খাতা অথবা ডাইরি থাকতো ভ্রমনের খুঁটিনাটি সেখানে লিপিবদ্ধ করে রাখতাম। কিন্তু ইচ্ছা করেই পুরনো ডাইরি আর খুলতে চাচ্ছি না। যথারীতি আমাদের ভ্রমনের উদ্দেশ্য কলেজ চত্বর থেকে ৪ টি বাস রওনা হলো সকাল ৭/৮ টার দিকে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১১ টার নাগাদ আমরা সিংড়া বনে পৌছলাম।সবাই যে যার মতো করে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে প্রবেশ করলাম বনের মধ্যে।বনে সেকি লম্বা লম্বা শাল গাছ! সব খানেই একধরনের নিস্বব্ধতা।একটা পাখির ডাক যে শুনবো সেটাও নেই।শুধু আমাদের কথাগুলোই বারবার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে কানে।
আর কিছুদূর পর পর উঁচু মাঝারি ধরনের উঁই পোকার টিবি। তবে সেগুলো আকারে বেশ বড় ও এবড়ো থেবড়ো।কলকাতার বাংলা সিনেমাতে মনসাদেবীর পূজোর জায়গার মতো টিবির সাইজ ও আকার। আবার মাঝে মাঝে আমরা ছোট বেলায় কলাপাতা দিতে যেরকম ঘর বানাতাম ঠিক তেমন শাল গাছের পাতা দিয়ে ছোট ছোট ঘর বানানো।কিন্তু সেগুলো কিসের জন্য তৈরি বা কারা বানিয়েছে তা জানাটা ছিলো দূরহ।কেননা জংগলের এদিকটায় আমরা ছাড়া কোন জনমানবের চিহ্ন নেই।ভয়ে ভয়ে আমরা প্রায় বনের মধ্যে চলে গেলাম। আর অগত্যা সেসব উঁই টিবির সাথে তখনকার ফিল্মের ক্যামেরার গুনে গুনে ছবি তোলা চলছে।গুনে গুনে এই জন্য বলছি কেননা তখন একটা ফিল্মে ৩০ টির বেশি ছবি তোলা যেত না।ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন থাকতো তবে ফিল্মের ৩০ টি নেগেটিভ এর জায়গায় ৩২ টা পর্যন্ত থাকতো।অবশ্য এখনকার কথা ভিন্ন।এখন তো ইচ্ছা করলেই হাতের মুঠোফোন দিয়েই শতশত আইকন ছবি তোলা যায়। এমনকি ছবি তোলার জন্য আলাদা করে কাউরে লাগেও না মন চাইলে একা একাই যতো ইচ্ছে ছবি তোলা যায়।তো আমরা বনের প্রায় মাঝামাঝি গিয়ে একটু জনমানবের সাড়া শব্দ পেলাম। দূরে কেউ একটা কিছু করছে আর সেখান থেকে কুঠার দিয়ে গাছে আঘাত করার শব্দ কানে আসছে।আমরা এগিয়ে যেতেই তারা ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
আমরাও তাদের দেখে কিছুটা ইস্তত।কেননা ওদের কয়জনের হাতেই ছিলো লম্বা হাতল ওয়ালা একধরনের দা প্রকৃতির অস্ত্র। যেটা আমাদের এখানকার অস্ত্র গুলোর সাথে আকার আকৃতির দিক দিয়ে কোনভাবেই মেলানো যাবে না।দুজন মহিলা আর তিনজন পুরুষ মানুষ।পুরুষের একজনের পরনে খুব খাটো করে ধুতি পড়া আর দুজনের পরনে লুংগির মতো খাটো করে পেচানো কাপড়।তবে সবার গা উদোম।আর মহিলা গুলো তাদের সীনা থেকে হাটু পর্যন্ত একটা লম্বা কাপড় দিয়ে পেচিয়ে রেখেছে।শরীরের বাকি অংশ তাদেরও উদোম। গায়ের রং কিছুটা পোড়া বেগুনের মতো কালচে ধরনের।তবে দেহ গুলো বেশ সুঠাম।মহিলাগুলোর গলায় বেরির মতো গয়না আর হাতে দাবনাতে সেই একই রকম গয়না।নাকে নাকের সাইজের চাইতে মস্তবড় একটা করে নাকফুল। তাদের দেখে আমরা যতোটা ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু তারা সে ভয় অভয়ে পরিনত করে ফেললো কিছুক্ষনের মধ্যেই। তাদের হাতের অস্ত্র নামিয়ে আমাদের জিজ্ঞেস করলো যে আমরা কোথা থেকে এসেছি।কিন্তু তার আগে তারা তাদের নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলাপ সেরে নিলো তাদের ভাষায়।যে ভাষা আমাদের বোঝা মোটেও সম্ভব না।প্রথমে ভেবেছিলাম তারা হয়তো বাংলা বলতে পারবে না, কিন্তু না তারা আমাদের সাথে অনর্গল বাংলায় কথা বলে যাচ্ছিলো।আমরা বললাম যে আমরা বগুড়ার একটা কলেজ থেকে পিকনিকে এসেছি।আরো অনেকেই আছে।পিকনিকে এসেছি শুনে তারাও কিছুটা আন্দিত বলে মনে হলো।”ও আপনেরা তাইলে পিকনিকে আসছেন। অনেকেই তো আসে “।
অনেক কথা শেষে তাদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম এ জংগলের শেষ প্রান্তে তাদের পাড়া আছে।যেটা সাঁওতাল পাড়া।সাঁওতাল পাড়ার গল্প শুনে সেখানে না গিয়ে কি আর থাকা যায়।তাদের কাছ থেকে সাঁওতাল পাড়া যাবার রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে আমরা মানে আমাদের গ্রুপে যারা ছিলাম তারা সবাই সাঁওতাল পাড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।লম্বা লম্বা শাল গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে দুপুরের কড়া রোঁদের তাপ মাথায় পরশ দিয়ে যাচ্ছে অনবরত।শীতের দিন হওয়ায় ফাঁকফোকর গলিয়ে রোঁদ বেশ আরামই দিচ্ছে। কিছুদুর যাবার পর আমরা বনের জংগলের ফাঁকফোকর দিয়ে সাঁওতাল পাড়ার অস্তিত্ব খুজে পেলাম। জংগল পেরিয়ে দেখলাম সাঁওতাল পাড়াতে যাবার জন্য একটা সরু কাচা রাস্তা।আর রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট ক্ষেতের জমি।যে জমিগুলোতে মহিলাদের কাজ করতে দেখলাম।মহিলারাই নিড়ানী দিচ্ছে,ফসল কাটছে আবার কেউ কেউ সেগুলো মাথায় চাপিয়ে তাদের বাড়িতেও নিয়ে যাচ্ছে। সরু মাটির কাচা রাস্তাটি সোজা চলে গেছে সাঁওতাল পাড়ার মধ্যে দিয়ে।এই সরু কাচা রাস্তার দু ধারেই সাঁওতালদের ছনের চালা আর মাটির দেওয়ালের ছোট ছোট ঘর।দুটো কি তিনটে করে এরকম ঘর নিয়ে একেকটি বাড়ি।আর বাড়ির ফাকা অংশগুলো কলার পাতার বেড়া দিয়ে ঢাকা।আমরা পাড়ার ঠিক প্রথম মানে আমাদের যাবার পথে রাস্তার সাথে প্রথম যে বাড়িটা সেটাতে গেলাম।বাড়িতে ঢোকার পথেই দুটো জবা ফুলের গাছ।গাছে বেশ লাল লাল জবা ফুল পুরো বাড়ির শোভা বর্ধনেই যেন নিয়োজিত।ও দিকে দীর্ঘক্ষণ কাঁচা মাটির রাস্তায় চলার ফলে আমাদের সবার পায়ের সাথে মোটা ধূলোর আস্তরণ। সেগুলোও ধুয়ে পরিষ্কার করাটা বেশ জরুরী বলেই সেই মহূর্তে মনে হয়েছিলো।তাই সাঁওতাল বাড়িতে প্রবেশ না করে উপায় নেই। আমরা সাঁওতাল বাড়িতে কোন রকম বাঁধার বা প্রশ্নের সম্মুখীন ছাড়াই প্রবেশ করতে পেরেছিলাম।কেননা তখন সেই বাড়ির সকল সদস্যই বাড়ির ভিতরে তাদের দুপুরের খাবার খেতে ব্যস্ত।তাই প্রশ্ন কর্তা কেউ তখন উপস্থিত নেই।বাড়ির ভিতরে প্রথমেই একটা গভীর নলকূপের দেখা পেলাম।দ্রুত সেখানে গিয়ে আমরা যে যার মতো করে হাত মুখ ধোয়ার কাজ শেষ করলাম, কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনটুকু মনে করি নি, যেন এ বাড়ি আমাদেরই।হাত মুখ ধোয়া শেষে পিছনে তাকিয়ে দেখি কয়েকজন চুলার পাড়ে বসে খাবার খাচ্ছে।পাশে ছোট একটা ছেলে দু পা ফাঁক করে পাছা মাটিতে ঠেকিয়ে কাসার থালায় দেয়া খাবার চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে কতোই না আনন্দ পাচ্ছে।সবার সামনেই সোনালী রঙের কাঁসার প্লেট। প্লেটের সামনে একটা করে কাঁসার গ্লাস।পাছার নিচে কাঠের ছোট ছোট টুকরো সেটে দিয়ে ব্যাঙ মোড়ার মতো বসে একেকজন খাচ্ছে।কাঠের টুকরো এজন্য বলছি কেননা আমাদের এখানে সাধারনত এরকম কাঠের টুকরোর নিচে দুপাশে দুটো খুড়া থাকে যা কাঠের টুকরা গুলোকে একটু উচু করে রাখে।যাকে আমরা আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় পিড়ে বলে থাকি।কিন্তু ওটার নিচে সেরকম কিছু ছিলো না।পুরোটাই মাটির সাথে সেটে ছিলো।
আমাদের দেখে খাওয়া শেষ না করেই একজন মেয়ে মানুষ, সম্ভবত তিনি ঐ বাড়ির কর্তৃ টাইপের কেউ হবেন, তিনি উঠে এসে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন।আমরা কে, কোথা থেকে এসেছি, এখানে কি চাই ইত্যাদি ইত্যাদি নানা প্রশ্ন? আমাদের বৃহৎ দলের পক্ষে এক এক করে তার সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রইলো।যেন কোন কিছুতেই প্রশ্নকর্তার কোন প্রশ্নের উত্তর মিস্টেক না হয়ে যায়।কেননা মিস্টেক হলেই নির্ঘাত ফেল করার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিলো।আসার আগেই কিছুটা শুনেছি যে, এসব সাঁওতালরা নাকি আমাদের মতো বোকাসোকা বাঙ্গালীদের একদম সহ্য করতে পারে না।দেখলেই মারার উদ্দেশ্য তেড়ে আসে। যেখানে দেখা না দেখার প্রশ্ন আর সেখানে আমরা ওদের কোন পারমিশন ছাড়াই একেবারে বাড়িতে ঢুকে পড়েছি।ভয় একটাই একটু এদিক ওদিক হলেই সব শেষ। কিন্তু কি অবাক ব্যাপার! কোথায় তারা তাদের বাড়িতে বিনা পারমিশনে প্রবেশের দায়ে একহাত নিবে তা নয়।উল্টো ওরকম আরো কয়েকটা কাঠের টুকরো এনে তাদের মাটির বারান্দায় পেতে আমাদের বসতে অনুরোধ করে যাচ্ছে!

(চলবে) —–

এম এম মেহেরুল
লেখক ও সাবেক চেয়ারম্যান,আলোর প্রদীপ
ই-মেইলঃmeharul.islam.1991@gmail.com

Check Also

শিক্ষার্থীদের মাঝে আলোর প্রদীপ সংগঠনের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ

সোনাতলা (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ শুক্রবার (১৭ জুন) বিকালে আলোর প্রদীপ সংগঠনের অস্থায়ী কার্যালয়ে “বাহার উদ্দিন দরিদ্র …

Leave a Reply

Your email address will not be published.

8 + sixteen =