সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / সামাজিক বিপ্লবের পথে—এম এম মেহেরুল

সামাজিক বিপ্লবের পথে—এম এম মেহেরুল

বর্তমানে আমাদের দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই হাজারো সমস্যা বিদ্যমান।এতে প্রতিনিয়ত হাবুডুবু খাচ্ছে নাগরিক জীবন।এমতাবস্থায় সমাজের এই নানাবিধ সমস্যাগুলোকে জয় করবার জন্য নতুন কৌশল নির্ধারণ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণে এক ধরনের দায়বদ্ধতাও অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে সেই দায়বদ্ধতার জায়গাটি উতরিয়ে যাবার জন্য যে কর্মসূচি প্রয়োজন সেটা তেমন জোরালোভাবে অগ্রসর হচ্ছে না।আমাদের দেশে অনেক বিষয়েই নানান জোড়ালো রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে বটে, কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের মূল আন্দোলনকে নিজের লক্ষ্য হিসেবে কেউ স্থির করেনি।যা আমাদের সমাজে সামাজিক অবক্ষয়ের ক্ষেত্রগুলোকে দিনদিন প্রসারিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। আমাদের এই সমস্যা সমাধানে আশু চিন্তাভাবনা করতে হবে এখনই।কেননা হত্যা,যৌন নির্যাতন,নারী নির্যাতন,শিশু বলাৎকার থেকে শুরু করে সমাজের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রগুলো যেভাবে দিনদিন আমাদের সামনে ভেসে ঊঠছে তাতেকরে নির্বিঘ্নে বসে থাকবার সময় আর নেই। কিন্তু কোন এক অজানা কারনে আমাদের দেশে সামাজিক দায়বদ্ধতার এই জায়গাগুলো জেনে হোক আর না বুঝেই হোক একপ্রকার পাশ কাটিয়ে যাবার প্রবনতা আছে। এই পাশকাটিয়ে যাবার প্রধান কারন হতে পারে আমাদের জ্ঞানচর্চার জায়গাগুলো মসৃণ নয়। জ্ঞান অর্জন থেকে জ্ঞান চর্চা ও প্রয়োগ সবখানেই আমাদের একপ্রকার আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখা হয়।যার ফলশ্রুতিতে আমাদের মনোজগৎ সামাজিক কল্যাণকর হয়ে গড়ে উঠছে না।

আমাদের দেশে স্বাধীনভাবে মুক্ত জ্ঞান চর্চা এখন অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত।এখন যত আওয়াজ ও তথ্য পাওয়া যায়, জ্ঞান ততটা পাওয়া যায় না। জ্ঞানের চর্চা এখানে বাধা পায় ক্ষুধার কারণে। সমাজ ক্ষুধার্ত।সে ক্ষুধা সত্য,ন্যায় ও চিন্তার জগতে অবাধ বিচরণের ক্ষুধা। অভিজাতদের ক্ষুধার চেহারা ভিন্ন। সমাজের এই ক্ষুধা দূর করতেবাস্তবতার নিরিখেই সব চাইতে সম্ভাব্য এবং যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান হচ্ছে- একটি সামাজিক পরিবর্তন বা সামাজিক বিপ্লব।এখন আসি সামজিক বিপ্লব আসলে কি বা এটি বলতে কি বোঝায়? সেই আলোচনায়। আমরা জানি, বিপ্লব অর্থ আমূল পরিবর্তন; যে জিনিসটি যেভাবে যে অবস্থায় ছিল, সে জিনিসটিকে সে অবস্থায় না রেখে, সে অবস্থায় থাকতে না দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ও ভিন্নতর অবস্থায় গড়ে তোলা। আর ‘সামাজিক বিপ্লব’ বলতে বোঝায়, মানুষের সমাজবদ্ধতাকে সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দেয়া। যে চিন্তা-বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর একটি সমাজ চলে আসছে, তাকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ পরিহার করে ভিন্নতর চিন্তা-বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে সমাজটিকে গড়ে তোলা। আমরা সর্বক্ষেত্রেই অভিজাত,সাধারণ থেকে অতি সাধারণ সকলেই সমাজবদ্ধতার মাধ্যমে নিজেদের সুখ খুজি। কিন্তু সামাজিক বিপ্লব না হলে সুখ সর্বজনীন হবে না।সুখকে সর্বজনীন করতে জ্ঞানের খুব দরকার, যে জ্ঞান আনন্দ দেবে। যে আনন্দ বিনোদনের চেয়ে বেশি। তখন মানুষ আর প্রয়োজনের জগতে আটকে না থেকে মুক্তির জগতে পৌঁছে যাবে।

তবে আশার কথা এই যে,আমরা যদি বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি আর পাবলিক সেন্টিমেন্টের দিকে একটু খেয়াল করি তবে দেখতে পাই- সামাজিক সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক সমস্যা এবং অপরাধ প্রবণতা যেভাবে বাড়ছে, সেই সাথে প্রতিবাদের মাত্রাও বাড়ছে। আগের মতো আর মানুষ নীরবে সব কিছু সহ্য করছে না। ক্রমেই প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠছে।এক্ষেত্রে শুধু সাধারণ জনগণই নয়, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-শিক্ষক, নারী -শিশু, যুব-কিশোর, আইনজীবী, সাংবাদিক এমন কী কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদরাও একই সুরে কথা বলছেন। প্রতিবাদটা যেমন হচ্ছে প্রকাশ্য,তেমনি ভার্চুয়াল জগতেও। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অন্যায়-অবিচার, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে তরুণ ও যুবসমাজ।

সবমিলেই দেশে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও সামাজিক নানা অসঙ্গতিতে যেভাবে জনগণ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠছে তাতে একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, এসব বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় একটা সামাজিক পরিবর্তনের পূর্বাভাস, আবার অনেকে সামাজিক বিপ্লবের পদধ্বনি হিসেবেও মনে করছেন। কেননা সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন,কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের নতুন করে ভাবায়।যে যাই বলুক না কেন, বিষয়টা একেবারেই উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। আমরা যদি নিকট অতীতে মিশর, তিউসিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের দিকে তাকাই সেখানে কিন্তু এভাবেই মানুষ সামাজিক ইস্যুতে একত্রিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তা রাজনীতিকেও ধাক্কা দেয়। বাংলাদেশে যে তেমনটি ঘটবে না সেটার গ্যারান্টি কে দিতে পারে?

এম এম মেহেরুল
লেখক ও চেয়ারম্যান,আলোর প্রদীপ
ই-মেইলঃ- meharul.islam.1991@gmail.com

Check Also

বারামখানা–ড.আজাদুর রহমান

ভীতু আত্মারা। এখানে এসো না, এটা বারামখানা। যারা আসে তারা জানে জীবন প্রয়োজন মৃত্যু তারও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − seven =