সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / বগুড়ার খবর / সায়েদ আলীর মোটরসাইকেল চালানোর স্বপ্নপূরণ

সায়েদ আলীর মোটরসাইকেল চালানোর স্বপ্নপূরণ

সারিয়াকান্দি প্রতিনিধিঃ অবশেষে মোটরসাইকেল চালানোর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন প্রতিবন্ধী সায়েদ আলী। তিনি গাবতলি উপজেলার দুর্গাহাটা ইউনিয়নের বৈঠাভাংগা গ্রামের মৃত রহমানের ছেলে। তবে তার বাড়ী সারিয়াকান্দি ফুলবাড়ি ইউনিয়নের সীমানা ঘেসে হওয়ায় তিনি প্রতিনিয়ত হাটফুলবাড়ী বাজারে যাতায়াত করেন।
জন্ম হতেই তার দুই পা ল্যাংড়া।
ছোটবেলা হতেই নিজের বুদ্ধিতে তৈরি হাত দিয়ে প্যাডেল করা বিশেষ যানে সে চলাফেরা করতেন। তবে গত ১২ আগষ্ট শনিবার বিকালে তার তৈরি ৩ চাকার বিশেষ ধরনের মোটরসাইকেল নিয়ে তিনি বের হন হাটফুলবাড়ী বাজারে। তাকে এবং তার তিন চাকার বিশেষ মোটরসাইকেল দেখতে রাস্তার দুইপার্শে সারিবদ্ধভাবে ভিড় জমান উৎসুক জনতা। একটি ডায়াং কোম্পানির পুরাতন ৮০ সিসির মোটরসাইকেলকে সামনের অংশ অপরিবর্তিত রেখে পেছনে একটি চাকার বদলে দুইটি চাকা লাগিয়ে তিনি এই বিশেষ ধরনের মোটরসাইকেল তৈরি করেছেন। মোটরসাইকেলটি তৈরি করতে হাটফুলবাড়ী বাজারের ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি লেবু মিয়া এবং মোটর মেকানিক আশরাফুল ইসলাম সহযোগীতা করেছেন।
প্রতিবন্ধী সায়েদ আলী দুর্গাহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। দারিদ্রতার কষাঘাতে পড়াশোনায় আর তিনি বেশিদূর এগুতে পারেননি। সংসারের অনটনের জন্য গ্রামেই তিনি ছাত্রদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। এর মাঝেই তিনি কঠোর সাধনায় কয়েকটি বিশেষ শারিরিক কসরত আয়ত্ত করেন।
সেই শারিরিক কসরতকে পুঁজি করেই তিনি বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন বাজারে সার্কাস খেলা দেখানো শুরু করেন। সার্কাস খেলা দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে শুধুমাত্র হাততালি দিয়েই তাকে খুশি করেন। কেউ অর্থ সহযোগীতা করেন না। উপায়ন্তর না দেখে তিনি বাজারে ব্যাথানাশক তৈল বিক্রি শুরু করেন। এই উপার্জন দিয়েই তার মা, স্ত্রী, ১ জন মেয়ে এবং ১ জন ছেলের সংসারের যাবতীয় খরচ মোটামুটি চলে যেত। কিন্তু দেশব্যাপী করোনাকালীন লকডাউনে তার এ সামান্য আয়টুকুও বন্ধ হয়ে যায়।
সায়েদ আলী দুই হাতের উপর ভর দিয়ে সমস্ত দেহ শূন্যে নিয়ে বিশেষ ভঙ্গিমায় বুকডন দিতে পারেন, হাতের উপর ভর করে পুরো শরীর চারদিকে দ্রুত ঘোরাতে পারেন, বিশেষ ভঙ্গিমায় হা ডু ডু খেলতে পারেন, বিশেষ ভঙ্গিমায় সাঁতার কাটতে পারেন, এছাড়া আগুন খেলা, গাড়ি বাইক খেলাসহ কয়েক ধরনের আকর্ষণীয় খেলা দেখাতে পারেন।
তার বড়ভাই বলেন, সায়েদ আলীর থাকার কষ্ট দেখে আমি তার থাকার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছি। হাতের সাহায্যে প্যাডেল করে তার তৈরি সাইকেল চালাতে তার বুকে অনেক ব্যাথা লাগে। তার চলার কষ্ট দেখে কয়েকদিন আগে মোটরসাইকেলটি তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা আমি তাকে দিয়েছি। কোন চেয়ারম্যান মেম্বার বা সরকারি সহযোগিতা আমার ভাই পায়নি। নিজের তৈরি হাত দিয়ে প্যাডেল করা সাইকেলে এতদিন সে চলাফেরা করলেও তাকে কেউ একটা হুইলচেয়ারের ব্যবস্হা করে দিতে পারেনি।
সায়েদ আলীর সাথে কথা হলে তিনি বলেন,
আপনিতো আসছেন ভাই আমাকে নিয়ে ব্যবসা করতে। সকল সাংবাদিকেরাই আমাকে নিয়ে ব্যবসা করেছে। হামি আর কোন কারো ব্যবসার পণ্য হতে চাই না। তিনি জানান, মোবাইলে আমাকে দেখিয়ে মোবাইল ওয়ালারা অনেক টাকা কামাই করেছে ভাই। মোবাইলে আমার নামে ভিডিও দেখিয়ে আমার প্রতিবন্ধী ভিডিও দেখিয়ে তারা টাকা কামাই করছে। ভিডিওতে তাদের নাম্বার দিয়ে তাদের নাম্বারে আমার জন্য সাহায্য চেয়েছে। এভাবে তারা অনেক টাকা কামাই করেছে। ইউটিউবে আমার খেলা গুলো দেখিয়ে ইউটিউব চ্যানেলের মালিকরা অনেক অনেক টাকার মালিক হয়া গেছে। আমাকে কিছুই দেয়নি ভাই। হামি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাদের ধরবেরও পাচ্চি নে। অন্যদিকে করোনাকালীন লকডাউনে হামার ব্যাবসাও বন্ধ। গেল ঈদগুলেত বাচ্চাগিরেক এডা নতুন কাপড়ও কিনে দিবের পাইনি ভাই। অনেক কষ্টে সংসার চালাই ভাই। ভাতা পান কিনা এ প্রশ্নে তিনি বলেন, মনে হয় পাই। কয়েকবছর আগে ৪ হাজার ৫ শত টাকা তুলে আনছিলাম। তারপর থেকে আর পাইনি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুর্গাহাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন জানান, সে ঠিকমত পরিষদে আসেনা, তাই তার কথা মনেও থাকেনা। তবে আমার জানামতে তার ভাতাকার্ড রয়েছে।
গাবতলি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছাঃ রওনক জাহান বলেছেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি আগে অবগত ছিলাম না। তবে তার বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হবে।’
সায়েদ আলী এখন খুব খুশি। তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রুপ নিয়েছে। তাকে আর হাত দিয়ে প্যাডেল করতে হয় না। এখন সে তিন চাকার মোটরসাইকেল চালায়। সরকারি সহযোগীতার আশা ছেড়ে দিয়ে সে এখন আবার বাজার বাজারে খেলা দেখিয়ে ব্যাথানাশক তৈল বিক্রি করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।

Check Also

সারিয়াকান্দিতে বঙ্গবন্ধু কর্ণার উদ্বোধন

সারিয়াকান্দি প্রতিনিধি: বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কর্ণার এর উদ্বোধন করা হয়েছে। রোববার দুপুরে উপজেলার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two − one =