সংবাদ শিরোনামঃ
প্রচ্ছদ / সাহিত্য-সংস্কৃতি / সুবিধা বঞ্চিত নাকি অধিকার বঞ্চিত শিশু?- এম এম মেহেরুল

সুবিধা বঞ্চিত নাকি অধিকার বঞ্চিত শিশু?- এম এম মেহেরুল

সুবিধা বঞ্চিত শিশু মানে কি? আমি মনে করি সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের পর রাষ্ট্র তাঁর নাগরিকের জন্য অতিরিক্ত যে সেবা নিশ্চিত করে সেটাই হচ্ছে রাষ্ট্র প্রদত্ত নাগরিকের জন্য সুবিধা। সুবিধা নানা রকম হতে পারে কিন্তু অধিকার নানা রকম হয় না।অধিকারের বিষয়গুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিতভাবে সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকে।যা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। যেমন রাষ্ট্রে বসবাসরত শিশুদের স্কুলবাস,স্কুলের ভালো রঙ্গিন ব্রেঞ্চ,মাথার উপর বৈদ্যুতিক পাখা,ইত্যাদি নিশ্চিত করা একটি সুবিধা। এটি সব স্কুলে নাও থাকতে পারে।কিন্তু একজন শিশু যে পরিবারেরই হোক না কেন,যে পরিবেশেই বেড়ে উঠুক না কেন তার জন্য সমতার ভিত্তিতে শিক্ষা গ্রহনের প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থাপনা পাওয়া শিশুর অধিকার।শিশুদের অধিকারগুলো কি? প্রতিটি শিশুর সঠিক পরিচর্যা ও নিরাপত্তা পাবার অধিকার আছে। তার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং রাষ্ট্র তার জন্য বয়স ও সময়োপযোগী আইন করবে যাতে তারা কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য অনুপযুক্ত সাজা না পায়। তাকে কোনভাবে শারিরীক, মানসিক বা অন্য কোন রকম নিবর্তন বা নির্যাতনের শিকার হতে দেয়া যাবে না এবং তাকে স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে বড় হতে দিতে হবে।পরিবারের সাথে থাকবার সুব্যবস্থা, নিজ ধর্ম বেছে নেয়ার স্বাধীনতা সহ নানা রকম বিষয়াবলী আছে যা শিশুর অধিকারের অন্তর্গত।

অনেক প্রতিষ্ঠানকে দেখি তারা সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার ব্যাবস্থা করতে ব্যস্ত।কিন্তু সুবিধা বঞ্চিত শিশু এই শব্দটি আমি কোনভাবেই বলতে রাজি নই।কেননা শিক্ষা গ্রহণ শিশুর কোন সুবিধার পর্যায়ে পড়ে না।এটা তার সংবিধান সম্মত মৌলিক অধিকারের বিষয়।যা তাকে রাষ্ট্র দিতে বাধ্য।বরং সুবিধা বঞ্চিত এই শব্দের বদলে আমি বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি অধিকার বঞ্চিত শিশু এই শব্দটিতে। আমাদের সমাজে আমরা নানাভাবে অধিকার বঞ্চিত। এই বঞ্চনা আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। ফলে আমরা এখন আর অধিকারহীনতা নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমাদের মস্তিষ্কে সেনসিটাইজেশন নামে একটি প্রক্রিয়া আছে, যার মাধ্যমে একটি ঘটনা বারবার দেখতে বা অনুভব করতে করতে সেই নির্দ্দিষ্ট বিষয়টিতে আমাদের কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। যেমন রাস্তার ফুটপাতে জীর্ণ-শীর্ণ মানুষ দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অথচ এমন মানুষ কোন উন্নত দেশে রাস্তায় দেখা গেলে তাদের দেশের নাগরিকেরা অস্বস্থিতে পড়বেন কারন সেখানে এটা রোজ দেখা যায় না। আমরা আমাদের দেশে এসব দেখে দেখে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন রাস্তায় বিকলাঙ্গ ভিখারী না দেখলেই আমরা অবাক হয়ে যাই।

যে শিশু তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, তার সুবিধা পাওয়া তো সেকেন্ডারী বা দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষয়। এবার আমাদের দেশের দিকে তাকাই। প্রতিটি শিশুর জন্য সমতার ভিত্তিতে শিক্ষা গ্রহনের ব্যবস্থা আমরা আজো করতে পারিনি।যে বয়সে তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা সে বয়সে তাদের এখনো শ্রম দিতে হয় মাঠে ও কারখানায়। যদিও গাল ভরে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর জন্য বিনা বেতনে দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষার কথা আমরা বলি। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে এগুলোকে আমরা তাদের জন্য সুবিধার পর্যায়ে নিয়ে গেছি।অথচ এসব তাদের অধিকারের অংশ হবার কথা ছিলো।দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নাই, স্কুলঘর নাই, বসার জায়গা নাই এবং এমনও স্কুল আছে যেখানে পালাক্রমে একেক ক্লাসের ছাত্ররা একেকদিন বেঞ্চ ব্যবহার করতে পারে কারন তাদের জন্য বেঞ্চের সংখ্যা অপ্রতুল। অথচ এই দেশে এমন স্কুল আছে যার মাসিক বেতন লক্ষ টাকার কাছাকাছি, সব ক্লাসরুমে এয়ারকুলার আছে,তারা শিক্ষা সফরে সুইজারল্যান্ড যায় এবং প্লে গ্রুপের শিশুদের খেলার জন্য জীবানুমুক্ত মাটি ই্উরোপ থেকে আমদানী করে নিয়ে আসে। এমন স্কুলে আমাদের দেশের বড় বড় মানুষদের ছেলেমেয়েরা পড়ে, যাদের বাবা মা দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা সহ সব বড় বড় বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে।

অধিকার নিশ্চিত করা একদিনে সম্ভব নয় এটা আমরা সবাই বুঝি। আমরা দরিদ্র, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়া তো অসম্ভব নয়? এই পদক্ষেপের মধ্যে প্রথমেই যেটা নেয়া সম্ভব সেটি হলো বৈষম্য দূরীকরণ। দেশের একজন শিশু টাকা আছে বলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করে বিদেশী মাটি ছানবে আর আরেকজন মাটিতে বসে পড়াশোনা করবে, এটা অপরাধ। কারন আমাদের সংবিধানে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথাও বলা আছে। রাষ্ট্র একদিকে সমতার কথা বলবে আবার একই দেশে নানা রকম শিক্ষা ব্যবস্থা, নানা রকম শিক্ষা সুবিধা এবং বড়লোক ও গরীব এর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয়গুলিকে জিইয়ে রাখবে সেটা সত্যিই অধিকার পাবার পথে প্রধান বাধা হিসবে চিহ্নিত।

আমরা অধিকার আর সুবিধাকে এক করে দেখতে গিয়ে কোন বিশেষ সুবিধা তৈরী করলে তাতে অধিকার অর্জিত হয়েছে বলে মনে করি।পথশিশু, পথকলি নাকি টোকাই এই নামকরন বিতর্কে ব্যস্ত থেকেছি কিন্ত তাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন করি নাই। স্বাভাবিক শিশুদের বেলাতেই আমরা এমন নির্দয়। যেসব শিশু প্রতিবন্ধি, অটিস্টিক, তাদের জন্য আমাদের চিন্তাতেই কোন স্থান নেই।এসবের সমাধান কি? আমরা ভাবি সমাধান কেবল টাকা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব। আসলে প্রথমে যা দরকার সেটি হলো স্বদিচ্ছা তারপর চাই স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। সামাজিক উদ্যোগ ছাড়া কখনো অধিকার অর্জন করা যায় না। অধিকার চাপিয়ে দেয়া বিষয় বা বইতে লেখা দুর্বোধ্য শব্দাবলী নয়। আচরণের মধ্য দিয়েই সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

প্রায় ষোল কোটি মানুষের এই দেশটাকে বদলে দিতে চাই শুধুমাত্র সংকল্প। শিশুদের অধিকার অর্জনের জন্য সভা সমিতি সেমিনার শুধু নয়, চাই সমন্বিত উদ্যোগ। নিজের ভাই বোনকে অধিকার বঞ্চিত রেখে দারিদ্রতাকে যতোই জাদুঘরে পাঠাই আর সুশাসন, গণতন্ত্র নিয়ে যতো গলাবাজি করি না কেন, সভ্য সমাজের সভ্য হয়ে ওঠার জন্য চাই সভ্য আচরণ। ছোটবেলায় মা যখন চুল আচড়ে দেন,তখন থুতনিটা হাতে ধরে নেন যাতে আমরা মাথা না নাড়ি। সমাজের সেই থুতনী ধরার মানুষ যারা, তারা সমাজের মাথা, বুদ্ধিজীবি, নেতা, রাজনীতিবিদ। তারা এখন আর সে কাজটি করছেন না। ফলে সমাজের মাথা নড়ছে প্রবল অনাচারে। কাউকে না কাউকে সেই কাজটি করতেই হবে। আগামী ভবিষ্যতের কাছে আমাদের চুপ করে থাকার কৈফিয়ত দিতে হবে। আমরা যদি কথা না বলি, তবে একদিন যখন আগামী প্রজন্ম প্রশ্ন করবে কেন চুপ করেছিলাম আমরা, তখন মাথা নিচু করে আবারো চুপ করে থাকতে হবে আমাদের। আমি সেই চুপকরা নির্বাকদের দলে থাকতে চাই না।

আসুন আমরা কথা বলি। আমরা আমাদের অধিকারের কাথা বলি। আমরা আগামী দিনের স্বপ্নের কথা বলি। আমরা আমাদের আশা আর ভালোবাসার কথা বলি। আমরা সেই দিনের কথা বলি, যে দিন কে কাছে আনবেন বলে ৭১ সালে প্রাণ দিয়েছিলেন আমাদের প্রিয় মানুষেরা।

( লেখক সামাজিক সংগঠন ‘আলোর প্রদীপ’ চেয়ারম্যান)

Check Also

বগুড়ায় মুজিবশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসবে সোনাতলা থিয়েটারের নাটক

বাঙালি বার্তা ডেস্কঃ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বগুড়ার উদ্যোগে ও জেলা প্রশাসন বগুড়ার সহযোগিতায় মুজিবশতবর্ষ ও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 5 =